আবার এসেছে আষাঢ়, এসেছে বর্ষা। আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের প্রথম দিন। পুষ্প–বৃক্ষে, পত্রপল্লবে, নতুন প্রাণের সঞ্চার করে, নতুন সুরের বার্তা নিয়ে সবুজের সমারোহে এসেছে বর্ষা।
বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সময় হচ্ছে বর্ষা। গ্রীষ্মের রুদ্র প্রকৃতির গ্লানি ও জরা ধুয়ে–মুছে প্রশান্তি, স্নিগ্ধতা ও সবুজে ভরে তোলে আষাঢ়। প্রকৃতি প্রেমিক মানুষের কাছে তাই বর্ষা নিয়ে আসে অভিনব ব্যঞ্জনা। আর বাঙালি মননে সবচেয়ে বেশি রোমান্টিকতার সুর বেজেছে এই বর্ষায়। গানে–কবিতায়–সাহিত্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে নানাভাবে।
বাংলা সাহিত্যে বর্ষা যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় : ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/ নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে।’
বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল প্রেমিকার জন্য প্রেমিকের শ্রেষ্ঠ উপহার। শুধু রবি ঠাকুর নন, মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য ‘মেঘদূত’ থেকে হুমায়ূন আহমেদ সবাই বর্ষাকে বরণ করেছেন ভিন্নভাবে। তাদের লেখায় ফুটে উঠেছে বর্ষাপ্রেম, সৌন্দর্য। সবাই বর্ষাকে দেখেছেন ভিন্ন চোখে, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য বারবার মুগ্ধ করেছে কবি মনকে, প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে বারংবার।
‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ দিয়ে প্রণয় নিবেদন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি নজরুল ইসলামের কাছে বর্ষাকে মনে হয়েছে ‘বাদলের পরী’। তিনি লিখেছেন : ‘রিম্ ঝিম্ রিম্ঝিম্ ঝিম্ ঘন দেয়া বরষে/ কাজরি নাচিয়া চল, পুর–নারী হরষে।’ বর্ষা যেমন আনন্দের, বর্ষার নির্মম নৃত্য তেমন হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। বাংলা ক্যালেন্ডারে আষাঢ়–শ্রাবণ দুই মাস নিয়ে বর্ষাকাল। তপ্ত ধরণীর বুকে বৃষ্টি প্রকৃতির রূপ বদলে দেয়। এই ঋতুতে নদ–নদীতে যেমন নতুন করে প্রাণ আসে, তেমনি গাছে ফোটে কদম, বকুলসহ নানা রকমের ফুল। কদমকে তো আষাঢ়ের প্রতীকই ভাবা হয়।
বর্ষা বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে আনে জীবনেরই বারতা। সুজলা, সুফলা, শস্য–শ্যামলা বাঙলা মায়ের নবজন্ম এই বর্ষাতেই।
‘আষাঢ় এলে সময়–অসময়ে ঝমঝম বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথঘাট, খাল–বিলে থৈ থৈ পানি, নদীতে বয়ে চলা ছবির মতো পাল তোলা নৌকার সারি। বর্ষার নতুন জলে স্নান সেরে প্রকৃতির মনও যেন নেচে ওঠে। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি। বনবীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়াসহ অসংখ্য ফুল। আষাঢ়ে প্রকৃতি রূপ–রঙে হয়ে ওঠে ঢলঢল।
আষাঢ় সাজে নানারূপে। নবধারা জলে স্নান করে শীতল হওয়ার আহবান এখন প্রকৃতিতে। নতুন সুরের বার্তা নিয়ে সবুজের সমারোহে আসে এ বর্ষা। কবিগুরুর ভাষায় : ‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে/ জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে/ ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা/ শ্যামগম্ভীর সরসা।












