১৬ থেকে ২৩ এপ্রিল আটদিন ধরে অনুষ্ঠিত হলো ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র। গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসবটি বেশ প্রাচীন। ১৯৩৫ সালে এর যাত্রা শুরু হলেও ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং নানান রাজনৈতিক সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময় উৎসবটি অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। এবারের উৎসবে ৪৩টি দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশও ছিল। যুবরাজ শামীম পরিচালিত ‘অতল’ ছবিটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এবারের উৎসবে। তবে উৎসবের অভিনব দিকটি ছিল, বিশেষ একটি ছবির প্রদর্শনী এবং বিশিষ্ট একজন অভিনেত্রীকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।
২০২৬ সালের মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে অজয় কর পরিচালিত-‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এবং এ–ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের স্মৃতিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। এ উপলক্ষে ছবিটির প্রিন্ট, ডিজিটালাইজড করা হয়, যার ফলে ছবির ভিডিও ও অডিও কোয়ালিটি সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করে। আমাদের এতদঞ্চলে সংরক্ষণের প্রবণতা অত্যন্ত দুর্বল। এ দিকটাই অমনোযোগ আর অবহেলার ফলে অনেক সংগীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে এ কাজটি অতীব জরুরি। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীসহ অনেক ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রিন্টগুলি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ঋত্বিক কুমার ঘটকের ছবির প্রিন্টেরও একই দুর্দশা হয়েছিল। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ক্লাসিকস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মার্টিন স্করসেসের উদ্যোগে ছবিগুলির প্রিন্ট ডিজিটালাইজড ও সাবটাইটেলড্ করা হয়েছে। মৃণাল সেনের প্রথম দিকের প্রায় সব ছবির প্রিন্ট হারিয়ে গেছে। শেষের দিকের ছবিগুলির প্রিন্ট মৃণাল সেনের পুত্র কুণাল সেন সংগ্রহ করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে জমা করে দিয়েছেন। এরকম প্রচুর–প্রচুর ছবির প্রিন্ট এখন আর নেই!
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংরক্ষণের অবস্থা আরও শোচনীয়। ৭০% ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। গুলিস্তান ভবনে একবার আগুন লাগে। সে অগ্নিকাণ্ডে ঐ ভবনে থাকা প্রযোজক পরিবেশকদের অফিসে রাখা প্রায় সব ছবির প্রিন্ট পুড়ে যায়। অন্য জায়গায় থাকা প্রিন্টগুলিও যত্ন সহকারে সংরক্ষিত হয়নি। যা কিছু আর্কাইভে রয়েছে সেগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে কেবল। কিন্তু বাংলাদেশের অনেকগুলি উল্লেখযোগ্য ছবির প্রিন্ট আজ আর নেই!

সাত পাকে বাঁধা– বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্মরণীয়। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একই নামের উপন্যাসটি নিয়ে বাংলা ছাড়া আরও কয়েকটি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তবে অজয় করের পরিচালনায় সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পাহাড়ী সান্যাল, ছায়া দেবী, তরুণ কুমার, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘সাত পাকে বাঁধা’ বিশিষ্ট হয়ে রয়েছে। অজয় কর কৃত সিনেমাটোগ্রাফি এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত এ ছবির অন্য দুটি বিশেষত্ব। ছবিতে কোনও গান নেই। তবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় রচিত টাইটেল ও থিম মিউজিক এবং আবহ সংগীত ছবিটিকে প্রাণময় করে তুলেছে। ছবির প্রধান দুটি চরিত্র অর্চনা ও সুখেনের ভূমিকায় সুচিত্রা এবং সৌমিত্রের অনবদ্য অভিনয় ছবিটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য।
অজয় কর ছিলেন মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান একজন পরিচালক। যে ৩০টি ছবি তিনি পরিচালনা করেছেন, তার মধ্যে সপ্তপদী, শুন বরনারী, অতল জলের আহ্বান, কাঁচ কাটা হীরে এবং সাত পাকে বাঁধা এই পাঁচটি চলচ্চিত্র ধ্রুপদী মর্যাদা পেয়ে গেছে। কাঁচ কাটা হীরে ছবির জন্যে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মৃণাল সেন। অজয় কর ছিলেন একজন প্রথিতযশা সিনেমাটোগ্রাফার। তাঁর সহযোগী ছিলেন বাংলাদেশের বেবী ইসলাম। পরে বেবী ইসলাম ঢাকার চলচ্চিত্রে সংযুক্ত হন।
একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত ও অন্য একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত নিয়ে গড়ে ওঠা কাহিনী রেখায় ১৯৬৩ সালে সাত পাকে বাঁধা নির্মিত হয়। সে সময়কার মূলধারার গৎবাঁধা রোমান্টিক সিনেমার পরিবেশে এই ছবি ছিল রীতিমতো ব্যতিক্রমধর্মী। সুচিত্রা উত্তম জুটির বাইরের ছবি। সে সময়ের সাধারণ দর্শক এই জুটিতে বুঁদ ছিলেন। অথচ দুয়েকটি ছবি ছাড়া এই জুটির স্মরণীয় কোনো ছবিই নেই। সুচিত্রা সেনও সে সময় কেবল গ্ল্যামারাস তথাকথিত রোমান্টিক ছবিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। বিশেষ করে উত্তম কুমারের জুটিতে। সাত পাকে বাঁধা–র চরিত্রটি ছিল এসবের বাইরে কয়েকটি শেডে রচিত। ফলে তিনি ভিন্ন ধরনের অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন অজয় করের দক্ষ নির্দেশনায়। জীবনে তেমন কোনো চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি সুচিত্রা। সামগ্রিক অবদানের জন্যে ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে (ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান) এবং ২০১২ সালে বঙ্গবিভূষণ উপাধি পেলেও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যে জাতীয় পুরস্কার পাননি।
১৯৬৬ ও ১৯৭৬ সালে যথাক্রমে মমতা ও আঁধি–এই দুই হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের জন্যে ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেলেও বিজয়ী হননি। তবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৬৩ সনে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাত পাকে বাঁধা ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে। এবং এটি ছিল উপমহাদেশের কোনো অভিনেত্রীর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তবে সুচিত্রার অভিনয়ের ধরন, অতিরিক্ত পারিশ্রমিক এবং অহংবোধের কারণে মুষ্টিমেয় কয়েকজন পরিচালক প্রযোজকের ছবিতে অভিনয় ছাড়া তাঁর পদচারণা কম বলে অনেকের ধারণা। তিন প্রধান; সত্যজিৎ–ঋত্বিক–মৃণালসহ তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, পীযুষ বসু, পার্থপ্রতিম চৌধুরী, পলাশ বন্দেপাধ্যায় প্রমুখ মেধাবী পরিচালকের ছবিতে তিনি কাজের সুযোগ পাননি। সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালীর পূর্বে ঘরে বাইরে ছবিটি করতে চেয়েছিলেন বিমলা চরিত্রে সুচিত্রা সেনকে কাস্ট করে। কিন্তু সুচিত্রাকে ঘিরে থাকা স্তাবক বাহিনীর ভুল পরামর্শে নবাগত পরিচালকের ছবিতে তিনি অভিনয় করেননি। অনেক পরে স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে সত্যজিৎ রায় ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। পূর্ণেন্দু পত্রী চতুরঙ্গ ছবিটির কাজ শুরু করেছিলেন দামিনী চরিত্রে সুচিত্রাকে রেখে। একদিন শ্যুটিং–এর পর ছবির কাজ বন্ধ হয়ে যায় প্রযোজকের মৃত্যুর কারণে। সত্যজিৎ দেবী চৌধুরানী ছবির কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন নাম ভূমিকায় সুচিত্রাকে নিয়ে। সুচিত্রা ডেট দিতে পারেননি! দীনেন গুপ্ত পরে দেবী চৌধুরাণী নির্মাণ করেন সেই সুচিত্রাকে নিয়েই! কিন্তু এর পর দীনেন গুপ্ত তাঁকে নিয়ে কৃষ্ণকান্তের উইল ছবিটি করতে চাইলে সুচিত্রা তাঁকেও ডেট দেননি।
১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মধ্য দিয়ে সুচিত্রার আগমন। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি। পরের ছবি কাজরী। কিন্তু সেটাও মুক্তি পায় পরে। মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি সাত নম্বর কয়েদি ১৯৫৩ সালে। তবে পাদ প্রদীপে আসেন মুক্তিপ্রাপ্ত দ্বিতীয় ছবি সাড়ে চুয়াত্তরের মাধ্যমে। নির্মল দে পরিচালিত সাড়ে চুয়াত্তর উত্তম সুচিত্রা জুটির প্রথম ছবি। সুচিত্রা অভিনীত শেষ ছবি–প্রণয় পাশা। মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৮–এই ২৫ বছরের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা মাত্র ৬১। ৫৪টি বাংলা, ৭টি হিন্দি। এর মধ্যে স্মরণীয় ছবি ৭ কি ৮। বেশিরভাগ ছবিই নিতান্তই সাধারণ মানের।
সুচিত্রা সেন যতটা না অভিনেত্রী, তার চেয়েও বেশি তারকা। অতিরিক্ত ক্যামেরা ও লাইটিং সচেতনতা, রূপসজ্জা–সাজসজ্জার দিকে বেশি মাত্রায় মনোযোগ তাঁকে অভিনয়ের স্বাভাবিকতা থেকে দূরে রেখেছিল। অভিনয় শেখার সুযোগও তাঁর হয়ে ওঠেনি। হয়তো তিনি তাঁর অভিনয়ের খামতির বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাই তিনি সেই খামতিকে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করতেন বিশেষ ধরনের ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, লাইটিং, তাঁর নিজের স্টারডম, ম্যানারিজম, গ্ল্যামার এবং ফটোজেনিক ফিগার–এ সবকিছু দিয়ে। এসব উপকরণ কখনও সুন্দরভাবে খাপ খেয়ে যেত তাঁর অভিনয় ও অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে। আবার কখনও বেমানান মনে হতো। ন্যাচারাল অ্যাকট্রেসও তাঁকে যেমন বলা যাবে না, তেমনই তাঁর অভিনয় মেথড অ্যাকটিং–এর পর্যায়ভুক্তও নয়। তাঁর অভিনয়ে সে সময়ের হলিউড অভিনেত্রীদের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে গ্রেটা গার্বো ও মার্ক ওবেরয়ের।
তবে, কানন দেবীকে স্মরণে রেখেও বলা যায়, বাংলা সিনেমার প্রথম নক্ষত্র সুচিত্রা সেন, যাঁর স্টারডম আজও অক্ষুন্ন। বাঙালির সপরিবারে সিনেমা হলে যাবার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল উত্তম সুচিত্রা জুটির কারণে। সিনেমাকে অভিজাত করে তুলেছিলেন তাঁরা। আগে যেখানে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল নিন্দনীয় কাজ, পাপাতুল্য, সিনেমার অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন নিম্নবর্গীয়, সেখানে তাঁদের ছবি এসব শুচিবায় থেকে মানুষকে মুক্ত করে সিনেমাকে আদরণীয় করে তুলেছিল। সিনেমার দর্শক সৃষ্টিতেও বৃদ্ধিতে এই জুটির অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশের পাবনা শহরের গোপালপুরে ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল জন্ম কৃষ্ণা দাশগুপ্তের। পিতা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। তাদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার ভাঙাবাড়ি গ্রামে। স্কুলে ভর্তির সময় কৃষ্ণার নাম দেয়া হয় রমা। তিনি ৫ ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে দাশগুপ্ত পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। সেখানে ১৬ বছর বয়সে ১৯৪৭ সালে শিল্পপতি দিবানাথ সেনের সঙ্গে কৃষ্ণার বিয়ে হয়। দিবানাথ সেনদের বাড়ি বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে। তবে তাঁরা স্থিত ছিলেন ঢাকা শহরের গেন্ডারিয়ায়। দিবানাথের পিতামহ ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত শিল্পপতি এবং সমাজ সংস্কারক। ঢাকার গেন্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী ও ব্যস্ত সড়ক দীননাথ সেন রোড তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়ে আজও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এহেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের বধু রমা সেন চলচ্চিত্রে এসে হয়ে যান কিংবদন্তী সুচিত্রা সেন। ১৯৭৯ সাল থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছরের অন্তরালবাসের শেষে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি চির অন্তরালে চলে যান ৮৩ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পরিক্রমার শেষে। কিন্তু আজও তিনি সসম্মানে সমাদৃতা।
সুচিত্রা সেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের স্বতন্ত্র অধ্যায়। ১৯৬৩ সালে পুরস্কৃত ছবি ও অভিনেত্রীকে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ ৬৩ বছর পরে আবারও স্মরণ করে ছবিটি নবায়ন ও প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশেষ সম্মান জানালেন এবং উত্তর প্রজন্মের কাছে নতুন করে উপস্থাপন করলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ ও শ্রদ্ধা নিবেদন।











