আনোয়ারায় ‘ভুল’ চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর অভিযোগ, তদন্ত কমিটি

সাঙ্গু ট্রমা হাসপাতাল ভাঙচুর

আনোয়ারা প্রতিনিধি | শুক্রবার , ৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ‘ভুল’ চিকিৎসায় মো. আয়ন নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বটতলী রুস্তমহাট এলাকায় অবস্থিত সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন নিহত শিশুর স্বজনেরা।

গত বুধবার রাতে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা হাসপাতালটিতে ভাঙচুর করে এবং তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরদিন বৃহস্পতিবার শিশুটির মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালের সামনে নিয়ে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয়রা। এ সময় তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এবং অনুমোদনহীন হাসপাতাল বন্ধের দাবি জানান। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী জানান, সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর শিশু মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. জামসেদ গিয়াস উদ্দীনকে সভাপতি এবং মেডিকেল অফিসার ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইকবাল মাহমুদ বেলালকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্য হলেন মেডিকেল অফিসার ডা. বিবি জয়নাব রিমা। তিনি আরো জানান, তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালে শিশুর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত আয়ন আনোয়ারার বারশত ইউনিয়নের গুন্ধীপপাড়া এলাকায় মায়ের সাথে নানার বাড়িতে থাকত।

আয়নের মামা সাইফুর রহমান বলেন, ‘বুধবার বিকেলে একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় আয়ন আহত হয়। এরপর স্বজনেরা তাকে দ্রুত সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তিন দিন পর পুনরায় চেকআপের জন্য হাসপাতালে আনতে বলা হয়।’ তিনি বলেন, ‘বাড়িতে নেওয়ার পর রাত ৯টার দিকে আয়নের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এরপর আমরা দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

কেইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত শিশুটির মা কুমকুম আকতার বলেন, ‘আমার আয়নকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কোনো ধরনের পরীক্ষা–নিরীক্ষা ছাড়াই সেলাই ও ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি বলেছিলেন, আমার ছেলে বিপদমুক্ত, কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরই তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পর আমার ছেলেকে আর বাঁচানো যায়নি। আমি মনে করি, সাঙ্গু হাসপাতালের ভুল চিকিৎসার কারণেই আমার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

বৃহস্পতিবার শিশুটির মরদেহ নিয়ে স্বজন ও স্থানীয় কয়েকশ মানুষ হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন। তবে এ সময় হাসপাতালের দায়িত্বশীল কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর শিশুটিকে আমাদের হাসপাতালে আনা হলে আমরা চিকিৎসাসেবা প্রদান করি। চিকিৎসা শেষে স্বজনেরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে রাতে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর শিশুটি মারা যায়।’ তিনি আরও বলেন, শিশুটির মৃত্যুর পর রাতে তার স্বজনেরা হাসপাতালে এসে ভাঙচুর করেন।

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ‘বটতলী রুস্তমহাটে সাঙ্গু ট্রমা নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।’ এদিকে স্থানীয়রা শিশুটির মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আনোয়ারায় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদোকানে মিলল গুচ্ছগ্রামের সরকারি রেশনের ২২ বস্তা গম, মালিককে জরিমানা
পরবর্তী নিবন্ধমুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী