আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য নেতা–কর্মীদের আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেতা–কর্মীদের আরও সজাগ থাকতে হবে। সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে ৫০ ভাগ অপরাধ কমে যাবে। নিজেদেরও কোনো অপরাধে জড়ানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই।
মঙ্গলবার রাতে র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে–ভিউয়ে বিএনপির এক সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নেতা–কর্মীদের এই বার্তা দেন দলের প্রধানমন্ত্রী। সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সাড়ে ৪০০ নেতা–কর্মী অংশগ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী সাংগঠনিক সভায় নেতা–কর্মীদের আগামী স্থানীয় নির্বাচনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গ্রহণযোগ্যতা আছে, জিতে আসতে পারে এমন প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচনে সরকার অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সরকারের ভালো কাজগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সমপ্রতি দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে চলা অপরাধ এবং সামাজিক অরাজকতা খুবই উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, ব্যবসা–বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, চুরি, নানা গুজব কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার নামে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতি দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে এবং জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা কমাচ্ছে। এজন্য আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি উপলব্ধি করেছেন, সরকারকে আরও সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে। অপরাধ দমনে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আধুনিক প্রযুক্তি, মনিটরিং সিস্টেম এবং পর্যাপ্ত মানবসম্পদ দিয়ে সক্ষম করা জরুরি। শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে অপরাধ কমানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বরেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধমূলক চক্রগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না কার কাছে গেলে নিরাপত্তা মিলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের পেশাদারত্ব ও সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা মব সন্ত্রাসকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই দেশের আইন– শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক চাপ বা দমনমূলক নীতি নয়, সঠিক আইন প্রয়োগই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। জনগণকে নিরাপদ বোধ করানো রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, এবং সেই দায়িত্ব পালনে সরকারকে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত, একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সহমর্মিতা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে দলের নেতাকর্মীরা ভূমিকা পালন করতে পারেন। বর্তমান সময়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের শান্তি নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ নিতেই হবে।
বিশ্লেষকরা বলেন, আইন–আদালতকে পাশ কাটিয়ে মব বানিয়ে বিচার করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের যে জিরো টলারেন্স নীতি, তাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রভাবমুক্ত হয়ে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও সুরক্ষা প্রদানে পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে; দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট ঠেকাতে সাইবার নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে– মব বা দখলবাজিতে নিজ দলের নেতাকর্মী যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মব সন্ত্রাসের বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।








