ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল–২) স্থাপন প্রকল্পের জন্য কঠোর শর্তে প্রায় ১০০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে পাওয়া এ অর্থায়নকে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ‘হাইলি নন–কনসেশনাল’ বা কঠোর শর্তের ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই প্রকল্পটি থেকে বড় অঙ্কের ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হলেও উচ্চ সুদের ঋণের কারণে সেই ব্যয় আবারো বেড়ে যাবে বলে শংকা প্রকাশ করা হচ্ছে। তুলনামূলক উচ্চ সুদ ও পরিবর্তনশীল অর্থায়ন ব্যয়ের কারণে ঋণটি ব্যয়বহুল হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির স্বার্থে সরকার এই অর্থায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। ৩১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের আগে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড পরিশোধন সক্ষমতা তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে, কমবে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা।
সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয় এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। ডিটেইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, নকশা, নির্মাণ তদারকি, কমিশনিং, সংশ্লিষ্ট ভবন ও অবকাঠামো ব্যয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়। সেই নির্দেশনা অনুসারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি ও বিপিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। কমিটি মূলধনী ব্যয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, প্রি–কমিশনিং ও কমিশনিং কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ সড়ক, প্ল্যান্ট সংশ্লিষ্ট ভবন এবং যন্ত্রপাতি খাত পর্যালোচনা করে সংশোধিত ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকায় নামানোর সুপারিশ করে। একনেক প্রকল্পটি স্ব–অর্থায়নে বাস্তবায়নের অনুমোদন দিলেও স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ইসডিবি) এ প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর সংস্থাটি প্রাথমিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
উক্ত প্রস্তাব যাচাই–বাছাই এবং বিশ্লেষণ করার পর ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছে। সরকার এই ঋণ নেয়ার ব্যাপারে অনুমোদন দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন–কনসেশনাল লোন (এসসিএনসিএল)-এর বৈঠকে ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়। আইএসডিবির অর্থায়ন দুটি পৃথক ‘ফরওয়ার্ড লিজ’ প্যাকেজে দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজে ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন এবং দ্বিতীয় প্যাকেজে ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার ঋণ থাকবে। পাশাপাশি প্রথম প্যাকেজের আওতায় ৬ লাখ ডলারের একটি কারিগরি সহায়তা অনুদানও দেওয়া হবে।
ইআরডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঋণটির সুদের হার আন্তর্জাতিক বাজারের এসওএফআরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ছয় মাস মেয়াদি এসওএফআর ৩ দশমিক ৮৪৬২৭ শতাংশের ভিত্তিতে হিসাব করলে মোট মার্ক–আপ দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪৪৬২৭ শতাংশ, যার মধ্যে স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়ামও অন্তর্ভুক্ত। ঋণের মেয়াদ ২০ বছর। প্রথম পাঁচ বছর রেয়াতকাল থাকলেও পরবর্তী ১৫ বছর প্রতি ছয় মাস অন্তর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু এসওএফআর পরিবর্তনশীল, তাই ঋণের প্রকৃত ব্যয়ও সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঋণ অনুমোদনের আগে ইআরডি বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বা ইস্টার্ন রিফাইনারির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে অন–লেন্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের দায় সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রকল্প প্রস্তুতির সব শর্ত পূরণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধন সক্ষমতা বর্তমান ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। নতুন ইউনিটে বছরে ইউরো–৫ মানের প্রায় ১১ লাখ টন ডিজেল, ৬ লাখ টন গ্যাসোলিন, ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল, ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৬০ হাজার টন এলপিজি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও হ্রাস পাবে।
সরকার ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে একনেকে নীতিগত অনুমোদনের সময় ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা, যা পরবর্তী যাচাই–বাছাইয়ে কমানো হয়।
কর্মকর্তারা জানান, আইএসডিবির প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ সুলাইমান আল জাসের আগামী মাসে বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। ওই সময় ঋণচুক্তি সই হতে পারে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে দীর্ঘদিনের বিলম্বে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, দ্বিতীয় রিফাইনারি আগে নির্মিত হলে সামপ্রতিক বৈশ্বিক ভূ–রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারত।
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এক দশকেরও বেশি সময় আগে। ২০১০ সালে প্রথম পরিকল্পনা ঘোষণার পর নানা সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, পরিবর্তন হয়েছে অর্থায়নের ধরন এবং একাধিকবার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থমকে গেছে। অবশেষে অর্থায়নের ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে ফরাসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেকনিপের সহায়তায় ইস্টার্ন রিফাইনারি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে পারে, যা থেকে দেশের জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশের যোগান দেয়া সম্ভব হয়। বাকি ৮০ শতাংশ তেলই পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়। যাতে অধিক ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও অনিশ্চিত থাকে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।










