মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, নারী যখন বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি বা সন্তানের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে, তা মূলত তার অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষ যখন ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, তখন তাকে বাহ্যিকভাবে ‘বহুরূপী’ মনে হলেও সেটা অনেক সময় তার টিকে থাকার লড়াই বা অন্যকে আগলে রাখার এক ধরণের কৌশল।
“নারীর নিজস্বতা বলতে আসলে কিছুই নেই।” এটি একটি বড় সামাজিক বিতর্ক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ প্রত্যাশা করে নারী হবে অন্যের পরিচয়ে পরিচিত–কারো মেয়ে, কারো স্ত্রী বা কারো মা। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে অনেক নারীই নিজের শখ, স্বপ্ন বা ইচ্ছাগুলোকে বিসর্জন দেন।
পিতার গৃহে, তিনি একজন স্নেহময়ী কন্যা, যেখানে তার আবদার করার অধিকার থাকে।
সংসার জীবনে, তিনি একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক বা সংবেদনশীল সঙ্গী, যেখানে ত্যাগের মহিমা অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায়।
মাতৃত্বে, তিনি নিঃস্বার্থ এক সত্তা, যেখানে নিজের অস্তিত্বের চেয়ে সন্তানের অস্তিত্ব প্রধান হয়ে ওঠে।
এই যে ক্রমাগত নিজেকে বদলে ফেলা, এটা যেমন একদিকে কষ্টের, অন্যদিকে নারীর ভেতরের বহুমুখী শক্তির পরিচায়ক। তবে প্রশ্ন থেকে যায়্তএই সবকিছুর মাঝে, তিনি নিজে কে? এই প্রশ্নটি করার সুযোগ বা পরিবেশ তিনি সবসময় পান কি না।
নারীকে ‘সবার মতো করে চলতে হয়’ এই বাধ্যবাধকতা মূলত আমাদের সামাজিক কাঠামোর ফল। অধিকাংশ সংস্কৃতিতে নারীর সাফল্য পরিমাপ করা হয় তিনি কতটা ভালো ‘মানিয়ে নিতে’ পারলেন তার ওপর ভিত্তি করে। ফলে নিজের পছন্দ–অপছন্দকে আড়ালে রেখে অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করাই যেন তার জীবনের ধ্রুবক হয়ে দাঁড়ায়।
তবে আধুনিক যুগে এই ধারণার পরিবর্তন ঘটছে। অনেক নারীই এখন তাদের পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকার পাশাপাশি নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। নিজস্ব ক্যারিয়ার, সৃজনশীল কাজ বা চিন্তার মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করছেন যে, বহুরূপী হওয়া মানেই নিজস্বতা হারিয়ে ফেলা নয়।
পরিশেষে বলা যায়, নারীর এই যে বিচিত্র রূপ, তা আসলে তার শক্তিরই একটি অংশ। তবে এটা সত্য যে, সমাজের চাপে অনেক সময় সেই শক্তিটি বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয়। নারী যখন এই সব ভূমিকার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের জন্য বাঁচতে শেখে, তখনই তার প্রকৃত ‘নিজস্বতা’ পূর্ণতা পায়।
আবার উচ্চ শিখরে পৌঁছেও পারিবারিক শান্তি বা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের ‘আমি’ বা নিজস্বতাকে বিসর্জন দেওয়া, এটি অনেক নারীর জীবনের এক অলিখিত সংঘাত।
এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি দিক বিবেচনা করা যেতে পার্ল্লে–
১. কাঠামোগত বনাম মানসিক সচেতনতা
বর্তমানে নারীরা শিক্ষা, ক্যারিয়ার এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কিন্তু এই সচেতনতা যখন বাস্তব জীবনের প্রয়োগে আসে, তখন তা সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার দেয়ালে ধাক্কা খায়। ফলে অনেক নারী নিজের অধিকার বুঝেও পরিবারের বৃহত্তর স্বার্থে বা অশান্তি এড়াতে আপস করতে বাধ্য হন।
২. মা হিসেবে আত্মত্যাগ
আমাদের সমাজে এখনো মাতৃত্বকে চরম আত্মত্যাগের সমার্থক মনে করা হয়। সন্তান লালন–পালনের ক্ষেত্রে অনেক সময় মায়ের নিজস্ব ইচ্ছা বা সাফল্যকে গৌণ করে দেখা হয়। একজন নারী কর্মক্ষেত্রে যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, ঘরের ভেতরে সন্তানের মানসিক প্রশান্তি বা পারিবারিক স্থিতিশীলতার জন্য তাকে প্রায়ই নিজের কণ্ঠস্বর নিচু করতে হয়।
৩. নীরব সংঘাত ও আপস
’অশান্তির ভয়’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী মনে করেন, নিজের স্বকীয়তা বা মতামত কঠোরভাবে প্রকাশ করলে পরিবারে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়বে। এই ‘মাদারহুড পেনাল্টি’ বা মাতৃত্বের দায়ভারের কারণে সচেতন হয়েও অনেকে নিজের নিজস্বতাকে পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারেন না।
৪. পরিবর্তনের ধীর গতি
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। এখনকার অনেক নারী চেষ্টা করছেন ক্যারিয়ার এবং পরিবার–দুটোর মধ্যেই একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে। যদিও এটি অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিকভাবে ক্লান্তিকর, তবুও আধুনিক নারীরা অন্তত এই প্রশ্নগুলো তুলছেন যা আগের প্রজন্মের অনেক নারী মুখ ফুটে বলতেও পারতেন না।নারীর এই সচেতনতা কি তবে কেবল কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে? পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে নিজের নিজস্বতা বজায় রাখা কি আদৌ সম্ভব, নাকি এটি সবসময়ই একতরফা আপসের গল্প হয়ে থাকবে?













