অন্ধ হয়ে আসা চোখের সাথে

সাদিয়া মেহজাবিন | শুক্রবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ

পিঁপড়েও জীবনী রচনা করে অদৃশ্যপ্রায় পায়ে। শব্দের আবহে ভাবছি সে জীবনীর বিস্তার মহাবিশ্বের মতোই কি? অথবা আমরা বুঝি না মানুষের বিবর্তন।
নিজের চার দশক পূর্তিকে কেন্দ্র করে বইয়ের ভূমিকাকে নিজের ইচ্ছেতে সাজিয়েছেন সাধু মিষ্টি ভাণ্ডারের পিছনের গল্প থেকে বাবা মায়ের শুভবোধের ইতিহাস দিয়ে। শরীরের প্রিয়তম অঙ্গ, পরিশ্রমী জুটিকে ভালোবেসেছেন। বলছেন চোখের কথা, অনিয়মে চোখের আলো ফুরিয়ে এলেও, গভীর আনন্দ, বাস্তব বা আত্মার সুখ পেয়েছেন চোখজোড়াতে। তাই বইয়ের নাম ‘অন্ধ হয়ে আসা চোখ’। লেখক ও কবি সৈকত দে।
সিনেমা, অনুবাদ, গল্প ও কবিতায় একসাথে সোনার তরী যেন। ‘আমার সত্যজিৎ’, ‘বুদ্ধদেব দাশগুপ্তঃ বীজের জীবন’, ‘বিস্মরণবিরোধী ফেলিনি’, ‘আন্দ্রে মুঙ্ক’ একসাথে স্থান পেয়েছে সিনেমার অংশে। অনুবাদে ওং কার ওয়াইয়ের সাক্ষাৎকার। চারটি গল্পের মধ্যে ‘একটি চমৎকার হাসির গল্প’ প্রথম আলোতে ছাপানো হয়েছে আগেই। পড়ার সুবাদও বেশি তাই। দুটি কবিতা শিশু ও অন্ধ হয়ে আসা চোখ।
চোখের স্মরণে বইটি উৎসর্গ করেছেন অমর বন্ধুদের। কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, বিদ্যুৎ ভৌমিক, জোবায়ের জুয়েল, বিজয় বিশ্বাসকে। সকলে আজ প্রয়াত এবং চট্টগ্রামের স্মৃতিতেও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চারকোণা বাঙে একটা তীর ছুটে চলেছে। যেন বিরাট যাত্রায় জাহাজ ছুটবে। সিনেমায় যেমন ইমেজ থেকে ইমেজের যাত্রা ঠিক সেভাবে ‘আমার সত্যজিৎ’। শুরুতে সত্যজিতের আদি বাড়ি দেখার লোভ একটা বিয়ে পড়িয়ে দিলো। তবে সে বাড়ির গল্প থেকে লেখক চলে যান উপেন্দ্রকিশোরের মানসবিশ্বের ইতিহাসে। সত্যজিতের স্মৃতিতে ইতিহাসও খানিক জানা হবে। প্রসঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমারের আগমন লেখাকে আরো রোমাঞ্চিত করে। তাই সচেতনভাবে সত্যজিতের জীবনীতে উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমার রায়ের ভূমিকা যে যথেষ্ট তা লেখক এড়িয়ে যাননি। বিশ্বের সত্যজিৎ কীভাবে লেখকের একান্ত হয়ে উঠলেন তার গল্প আনন্দদায়ক। দশ টাকার প্রাইজবন্ড চুরি করে আনন্দমেলা ১৪০০ হয়ে উঠেছিলো বীজ। ‘আগন্তুক’ এর শেষটা দেখেই পরিচালক সত্যজিতের সাথে পরিচয় নিবিড় হয়েছে। ‘আমার সত্যজিৎ’ শিরোনামে এ-লেখায় পাঠক কেবল লেখকের সত্যজিতকে পাবেন বললে খানিক ভুল হয় কেননা অনেকদিনের জমানো ইতিহাস দিয়ে সাজানো লেখাটি জানার রাস্তাও প্রসিদ্ধ করেছে। সাথে সিনেমায় সত্যজিতের পর্যবেক্ষণ করা বিষয়ে বিশ্লেষণ সিনেমার প্রতিও ভালোবাসা ও জ্ঞান জন্মাবে।
বাঙালি ঘরঘেঁষা বলে অনেকে গালমন্দ করেন। বইতেও সত্যজিত আর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে বেশ টান অনুভব করি। ‘বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: বীজের জীবন’ নামকরণ সমস্তটা যেন ব্যক্ত করে। লেখক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নামের সাথে মুগ্ধতা তুলে ধরতে সূচনা করেছেন মনীষা আর অরূপের বয়ে যাওয়া হাওয়া নিয়ে। যেখানে প্রত্যেক বাক্যকে মনে হচ্ছিলো একেকটা ইমেজ। একদা একজন বলেছিলো আমায়, ভালো কিছু পড়ার অন্যতম আনন্দ সম্পূর্ণ ইমেজের নিজস্ব কল্পনা বাড়াতে পারা।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের লেখক ও কবি সত্তা নিয়ে বিশেষ কোটেশন বোধহয় এটাই, ‘মানুষ যদি প্রকৃতির ভাষা বুঝতো, আত্মহত্যা বিলুপ্ত হয়ে যেত বলে মনে হয়।’ এক্ষেত্রে আবহ বুঝতে মণীন্দ্র গুপ্তের কথাও বেশ গুরুত্বের সাথে এসেছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের লেখাটি সম্পূর্ণ সিনেমানির্ভর আলোচনা হবে, এমনটা ভেবে পড়লে মন নারাজ হতে পারে কেননা বুদ্ধদেবের আরো সত্তা ও সমসাময়িক অনেক গুণীর আলোচনারও সন্ধান মিলবে এতে।
পনেরো বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা বালকটি পরবর্তীতে লেন্স আর ফিল্টারকে নিজের আঙ্গুলের মতো চিনে নিয়েছিলেন। তাই হয়তো লেখক এক বাক্যে সারাংশ জানিয়েছেন, বুদ্ধদেবের সিনেমা প্রায়শই সংলাপবিরল, কবিতাধর্মী।
তথ্যের সন্ধানেও যদি কেউ বইটি পড়ে নিরাশ হবে না। এক্ষেত্রে লেখকও শেষে ঋণ স্বীকারে কার্পন্য করেননি। সিনেমার অংশে কোথাও যদি মনে হয় শব্দ বা বাক্যের বোধ গুরুগম্ভীর তবে তা নয়। আজকাল তরুণ প্রজন্মের মুখে ডেট, ক্রাশ ধরণের শব্দকে অনেক লেখকই এড়িয়ে চলেন, ঠিক ফরমাল নয় বলে । তবে বইতে ফেলিনি নিয়ে লেখাটিতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আধুনিকতার ছায়া ধরে সঠিক স্থানে এসব শব্দের ব্যবহার স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।
অনুবাদে ওং কার ওয়াইয়ের সাক্ষাৎকার অবশ্যই সরল-সহজ ভাষায় করা। আমরা যেভাবে পেতে চাই সাক্ষাৎ ঠিক সেভাবে। বইয়ের আন্দ্রে মুঙ্কের অংশে সাতজন নির্মাতার মন্তব্যের অনুবাদও বেশ উপযোগী। যেমন কাজিমিয়ের্জ কারাবাৎজের মন্তব্যটি, ‘আর সবসময়,আমরা বাস্তবের সংবেদ ও ধারাবাহিক প্রকাশ্য অনুসন্ধান নিয়ে তৎপর থাকি- আলঙ্কারিক অর্থে নয় বরং এর রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে।
অনুবাদ প্রসঙ্গে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে একটি প্রশ্ন রাখা যায়, জিগা জের্তভের অনুবাদে বলা হয়েছে, ‘মানুষ একটা সিনেমাটোগ্রাফিক কাজকে চারটি শব্দে বিবৃত করতে পারেঃ ‘চোখ যা দেখে’। তবে চতুর্থ শব্দটি কি? জানার আশাটুকু রেখে গেলাম।
‘একটি চমৎকার হাসির গল্প’ প্রথম পড়ায় ভেবে নিয়েছিলাম চরম হাসির কিছু হবে কেননা লেখকের রসবোধ নিয়ে দ্বিধা নেই। উইট এন্ড সেন্স তাঁর প্রখর। নিরু আর অপুই প্রধান চরিত্র হতে পারে অথবা অপরাজিতা। আধুনিক বিশ্বে অপু আর নিরু পুরনো নাম মনে হলেও এদের লিঙ্গভেদে উপস্থিতি প্রশ্ন তোলে অপু আর নিরুর মধ্যে আদতে কে প্রেমিক আর কে প্রেমিকা। আত্মিক এবং শারীরিক প্রেমের চরম প্রবাহ সাথে স্মৃতিচারণ বিষাদময়। তাদের অসম্পূর্ণ প্রেমে অপরাজিতাই বা কে? কেবলই প্রশ্নের জন্ম হয়। পরপর ইমেজে সব যেন ঘোলাটে লাগে, মনে হতে পারে প্রলাপ। তাই নাম চরম হাসির গল্প হলেও হাসি মেলা ভার। বরং দুঃখ হয় অপরাজিতাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও আর ফিরলো না কেনো সে। অথবা এতসব কিছু কেবল স্বপ্নই ছিলো।
অন্ধ হয়ে আসা চোখের সাথে তৃষ্ণা বাড়বে নিশ্চয়। লেখকের নিজস্ব গদৎভাষা আছে জানি, তার প্রমাণও মেলে। সব গল্পে লেখকের আবছা একটা ছায়া রয়েছে। বিষাদের বায়ু সহজে ছড়ায়, অন্ধ হয়ে আসা চোখও মস্তিষ্ক ঘোলাটে করে। ভাবনা থেকে ভাবান্তরের রাস্তা খুঁড়ে চলে। লেখক তার দীর্ঘ যাপনে যতসব তথ্য, ভালো সিনেমার নাম জেনেছেন সবকিছু থেকে আপন সুরে একেকটি বাক্য রোপণ করেছেন বলে অনুভূত হয় কেননা গাছই যেমন একমাত্র প্রাকৃতিক উপায় কার্বন রিসাইক্লিংর, তেমনই বইয়ের প্রতিটি বাক্য সময় এবং মনকে উজ্জীবিত করে। ফলে সহজেই বিমুখ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে একদা ভাবতাম কবিতার বই হলে রেখে পড়া যায়, কিন্তু গদ্য শ্রেণির বই টানা পড়া উত্তম; খাপ ছাড়া লাগে। কিন্তু ‘অন্ধ হয়ে আসা চোখ’ ধীর গতিতে পড়ে তুষ্ট হতে হয়েছে। প্রত্যেক বাক্যের আলাদা অস্তিত্ব আছে, কবিতার ছলে মোহিত করে। তাই অন্ধ হয়ে আসা চোখের সাথে…কবিতার দ্বিতীয় স্তবক পাঠ।
‘বিয়ের পর বউয়ের প্রেমে পড়া কোনো আশ্চর্য ব্যাপার নয়।
অহরহ ঘটে, জলের মত সরল।
যখন কেউ তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করে শ্বাস ফেলতে পারে না বলে,
তখন বিস্ময়চিহ্নের জন্ম ঘটে বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসে।‘