অধ্যাপক এল এ কাদেরী : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের স্মরণীয় বরণীয় দিশারী প্রাক্তনী

ইমরান বিন ইউনুস, চমেক প্রাক্তনী ১৫ প্রজন্ম | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক এল এ কাদেরী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় প্রজন্মের প্রাক্তনী। ১৯৫৭ সনে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে এখন চলছে ৬৯ প্রজন্মের কোলাহল। লম্বা মিছিল। এখানকার প্রজন্মরা প্রাক্তনী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশদেশান্তরে। পূর্বের জাপান থেকে নতুন দুনিয়ার যুক্তরাষ্ট্রে। মাঝখানে ফেনার রাজ্য আফ্রিকা বা ইউরোপ। আমি দেশে দেশে তাদের পেয়েছি, অত্যন্ত সুনামের সাথে যারা কাজ করছেন বিভিন্ন কর্মযজ্ঞে। এই প্রাক্তনীদের ক্রম প্রসারমান মিছিলে একজন প্রাক্তনী এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সবার মনে গেঁথে আছেনসমুজ্জ্বল। অনুজ, অগ্রজ, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থী, রোগী, বিভিন্ন সংগঠন, ব্যাপক জনসাধারণসহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহায়তায়।

ঈর্ষণীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মোটামুটি তৎকালীন যুক্তরাজ্যে ছিলেন। নিউরোসার্জারির মতো তখনকার দিনে ক্রম প্রসারমান জটিল বিষয়ে। সত্তরের দশকে আমরা যখন মেডিকেল ছাত্র ও প্রশিক্ষণার্থী, এই বিষয়ের নাম জানতাম, জানতাম কিছু থিওরি। কিন্তু চেনা ছিল না। সারা দেশে তদানীন্তন স্নাতকোত্তর মেডিকেল ইনস্টিটিউটে স্বল্প পরিসরে চালু ছিল নিউরোসার্জারি এবং নিউরোসার্জনও ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন।

দেশে তখন নতুন জোয়ার চলছে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের আহ্বানে লোভনীয় বিদেশের অবস্থান ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হলো ফেরার পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাঁর যথাযথ পদায়ন হলো না। ফার্মাকোলজির সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো। ডাক নেই, তলব নেই, নিধিরাম সর্দার। ওয়ার্ড নেই, টিম নেই, যন্ত্রপাতি নেই, নেই অনেক কিছু। ওয়ান ম্যান টিমের যাত্রা শুরু। একটু একটু করে জোড়াতালি দিয়ে এগিয়ে চলল নিউরোসার্জারি কর্মকাণ্ড। নিজেই বিশেষজ্ঞ সার্জন, ডাক্তার, নার্স, অক্সিলিয়ারি সব। লাগসই প্রযুক্তি দিয়ে কাজ চালানো। আমরা এসব দেখেছি। তারপর ধীরে ধীরে বর্তমান অবস্থায়। দেশের দ্বিতীয় নিউরোসার্জারি বিভাগ। শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ তৈরির কারখানা। হাতে গোনা কয়েকজন থেকে এখন কত কত নিউরোসার্জন। কত মৃত্যু ঠেকানো। ওয়ান ম্যান শো থেকে এখন মুখর নিউরোসার্জারি অঙ্গন। অনেক পরে তাঁর যোগ্য অবস্থানে পদায়ন হয়েছিলঅধ্যাপক নিউরোসার্জারি। কী বিচিত্র আমাদের দেশ। হয়ত মিলে যায় সেই গানের লিরিক-‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে, আমরা ক’জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি’। সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর ঘরানায় তৈরি হয়েছে অনেক অনেক নিউরোসার্জন।

আইকনিক বলে একটা শব্দ আছে। অধ্যাপক কাদেরী ছিলেন তাই। ঐতিহাসিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত এই জাতির বিবাদ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে প্রায়ই ঢেউ তুলে। একজনই ছিল তখন যার ডাকে সব বিবাদ নীরব হয়ে যেত। যার বদলি এখন পর্যন্ত আর কেউ হননি। সকল প্রাক্তনী আর বর্তমানের তিনি ছিলেন সুপ্রিয় শ্রদ্ধেয় অগ্রজ ও নেতা এবং সংযোগ। সমাজ সেবায়ও অগ্রণী। প্রাগ্রসরমান সামাজিক কল্যাণমূলক আন্দোলনেও কখনও পিছিয়ে থাকেননি। অনেক সম্মাননা, পদক যেমন তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে তেমনি দেশের পেশাসহ অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেরও গাথা আছে।

তাঁর কর্মকাণ্ড অনুরণন তুলে রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘ঘটে যা তা নয়, যা রচি তাই সত্য, কবি তব মনোভূমি রামের অযোধ্যার চেয়েও সত্য’। তাঁর কাজের রচনাগুলো চট্টগ্রাম তথা দেশের সবখানে গুঞ্জনে মুখরিত। উনার একটা কাজের সুচারুতার একটা থিম আমার মনে আছে। পরিপূর্ণ মানসিক প্রশান্তি ও মনোযোগ ছাড়া কখনও ছুরি হাতে নিতেন না কারণ নিউরোসার্জারি খুব সূক্ষ্ম অপার, ধৈর্যের কাজ, একটু এদিক করলে জীবন বা অঙ্গ বা ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

১৯৭৮। আমি তখন ইন্টার্নশিপ ট্রেইনি। কলেজে শুনলাম একজন চৌকস নিউরোসার্জন জিয়াউর রহমানের আহ্বানে দেশে ফিরে যোগদান করেছেন। কদিন পর আমাদের ওয়ার্ডে একটা রোগী দেখতে গেলেন। অবাক হয়ে দেখলাম কী দক্ষতায় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সাবলীলভাবে কঠিন স্নায়ুতন্ত্রের পরীক্ষা করে ফেরলেন। আরও অবাক, চিনলাম উনি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএমও ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ অত্যন্ত গুরুতর আহত অবস্থায় আমাকে নিয়ে আসা হলে উনি আমার চিকিৎসা করেছিলেন এবং এখানকার মতো আমার বাবার সাথে কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল। পরম আশ্চর্যের ব্যাপার হলো উনিই পরবর্তীকালে আমার পরমাত্মীয় ও গুরুজন তথা চট্টগ্রামে অভিভাবক হয়ে যান। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছোট শালিকা হয়ে যায় আমার জীবন সঙ্গিনী। ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ সালে আমার আঙুলে বিয়ের আংটি তিনিই পরিয়ে ছিলেন। তাই আমার এ বর্ণনা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হতে পারে। দুঃস্বপ্নেও আমি কখনও কল্পনা করিনি কখনও আমাকে এ স্মরণিকা লিখতে হবে।

অগ্রজ ও সহপাঠীদের কাদেরী, অনুজদের কাদেরী ভাই, জুনিয়র সহকর্মী ও ছাত্রদের কাদেরী স্যার, আমার কাছে পরে যিনি হয়ে গেলেন দুলাভাই। আমার উপলব্ধি তিনি একজনই, একমাত্র নমুনা, যার জীবন ছিল সেই প্রতিফলন। ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায় পাতায় পাতায় ফাগুন মাসে কী উচ্ছ্বাসে ফুল ফোটাবার এই খেলা’।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের স্মরণীয় বরণীয় দিশারী কাদেরী নামের এই প্রাক্তনী কাল থেকে কালান্তরে আপন উচ্ছ্বাসে ফুল ফুটিয়ে যাবেন।

লেখক : অধ্যাপক ইমরান বিন ইউনুস, ইন্টারনিস্ট ও নেফ্রোলজিস্ট, প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধান নেফ্রোলজি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকজন শিক্ষক, যিনি আজীবনের মেন্টর : প্রফেসর এল এ কাদেরী
পরবর্তী নিবন্ধশ্রদ্ধার্ঘ্য- আমার বাবা