যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রযোজন হয় পরিকল্পনা। অর্থাৎ প্রথমে একটি অর্থনীতির উন্নয়নের গতি ও উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। বাংলাদেশের ন্যায় দরিদ্র দেশগুলোতে অর্থনীতির সকল খাতকে একসাথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কারণ সকল খাত এগিয়ে নেয়ার মত আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের ন্যায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও নেই। এই কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কোন কোন খাতকে এগিয়ে নেয়া হবে তা নির্ধারণ করার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনার। পরিকল্পনা আবার তিন ধরণের হতে পারে। যেমন স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা সময়কাল ধরা হয় সাধারণ এক বৎসর থেকে পাঁচ বৎসর। মধ্যম মেয়াদীর সময়কাল পাঁচ থেকে বিশ বছর। আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সময়কাল ধরা হয় বিশ থেকে ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৯৭৩ সালে। এই পরিকল্পনার মেয়াদ ছিল ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত। তখনও সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। অর্থনীতির সকল কর্মকাণ্ড রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। তাই প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ যখন ১৯৭৮ সালে শেষ হয়ে যাচ্ছিল তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক অসুবিধার কারণে লক্ষ্যবিহীন অর্থনীতিকে উদ্ধার করার জন্য দ্রুততার সাথে দ্বি–বার্ষিকী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই দ্বি–বার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ ছিল ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮০ সাল। পরবর্তীতে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৫ সালের জন্য আর একটি পঞ্চ–বার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। একে বলা হয় দ্বিতীয় পঞ্চ–বার্ষিকী পরিকল্পনা। এরূপ পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে হয়। ২০২৬ সালের প্রথম দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নীতি সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ৩৬ সদস্য বিশিষ্ট এই বিশেষজ্ঞ কমিটি যথাসময়ে কাজ শুরু করে। এই কমিটি প্রধান দায়িত্ব হলো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। যেটি মূলত ২০২৫–৩০ সালের জন্য পরিকল্পনা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য ২০২৫–৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে জিডিপির ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, জিডিপির ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ ও সুনীল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির খাতভিত্তিক সংস্কার ও সম্প্রসারণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে জিডিপির আকার বর্তমানে ৪৯৫ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৪২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। শুধুমাত্র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করলে তা গতানুগতিক ধারায় থেকে যায়। ফলে বাস্তবতার সাথে পরিকল্পনার ব্যাপক ব্যবধান দেখা যায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সাথে যদি এর প্রয়োগিক দিক নির্দেশনা না থাকে তবে সমন্বিত উন্নয়ন কখনো হবে না। এর ফলস্বরূপ দেখা যায়, অপরিকল্পিত নগরায়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য ও পরিবেশগত চাপ। ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগর আজ এরূপ ব্যর্থ পরিকল্পনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই দুই বৃহৎ সিটিতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে নগর সভ্যতা। একদিকে অট্টালিকা আর অপরদিকে রয়েছে শত শত বস্তি ও পথ শিশু। এই অব্যবস্থাপনা আরো স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ ও সুযোগ–সুবিধা ঢাকা কেন্দ্রিক। অপরদিকে দেখা গেছে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে অভারসাম্য। দেশের অনেক অঞ্চলে উন্নয়নের ছোঁয়া এখনও লাগেনি। এই অসম উন্নয়ন নানাবিধ অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করেছে। একই সাথে তৈরি করেছে সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনের জন্য কোথায় কোন ধরণের বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আনতে পারে তা বিবেচনা করা হয় না, আর এসব কিছু বিবেচনা করে যদি বাস্তবায়ন কর্মকৌশল নির্ধারিত হয় তবে তা হবে সমন্বিত বাস্তব পরিকল্পনা। এরূপ বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা না করে যদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকাঠামো ঠিক করা হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারবে না। এ কারণে পরিকল্পনার আওতা, পরিকল্পনা পদ্ধতি ও বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করতে শুধু অর্থনৈতিক চিন্তা নয়, বরং সমন্বিত বাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়নে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশে পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়ে থাকে মূলত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে বা পরামর্শকের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা পরামর্শ কর্তা–ব্যক্তিরা মনে করে থাকে যে, সাধারণ জনগণের প্রয়োজনীয়তা বা জন–আকাঙ্ক্ষা তারাই ভালো জানে। কতিপয় কর্মশালায় নিজস্ব চেনা জানা কিছু মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়কে ‘স্টেক হোল্ডার কনসালটেশন’ হিসেবে চালিয়ে দেন। বাস্তবিক পক্ষে এই পরিকল্পনার সঙ্গে সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকে না। আবার এই পরিকল্পনা যতটুকু কারিগরি অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। অতএব সর্বস্তরের জনসম্পৃক্তা থাকে না বললেও চলে। সাধারণত উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং যে কোনো উন্নয়নকৌশল বা কর্মকাণ্ডে স্থাপিত হয় সব মহলের মালিকানা বা অধিকার। এটা নিশ্চিত করা না হলে জনগণের সরকার হয়ে পড়ে আমলা ও প্রশাসন নির্ভর। এই অবস্থায় পরিকল্পনা হয়ে পড়ে জনবিচ্ছিন্ন। যে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো। কিন্তু সমন্বিত বাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোকে কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ২০৩৪ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির আওতার এক ট্রিলিয়ন ছড়িয়ে যায় তবে ধরে নেয়া যায় যে, ২০৫০ সালের মধ্যে এ দেশের অর্থনীতি তিন ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কোটি। এসময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় ৭–৮ গুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান জনসংখ্যার সাথে যুক্ত হবে আরো প্রায় ৫ কোটি মানুষ। কোথায় থাকবে ২২ দশমিক ৫ কোটি জনসংখ্যা? কীভাবে সংস্থান হবে বাড়ি ঘর, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শিল্প কারখানা, অফিস–আদালত এবং নাগরিক অন্যান্য সুবিধা? ২০৫০ সালে বাংলাদেশের আয়তন বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে দেশের মোট আয়তনের ৬০ শতাংশ ভূমিকে কৃষিজমি হিসেবে গণ্য করা হয়। শুল্ক মৌসুমে জলাভূমি ২০ শতাংশ এবং বনভূমি ১২ শতাংশ বলে ধরা হয়। কাজেই কৃষিজমি, জলাভূমি ও বনভূমিতে মোট জমির পরিমাণ হয় ৬০ + ২০ + ১২ = ৯২ শতাংশ। অবশিষ্ট (১০০–৯২)=৮ শতাংশ ভূমি দিয়ে ২০৫০ সালে ২২ দশমিক ৫ কোটি জনসংখ্যার আবাসস্থল সংকুলান করা কি সম্ভব? সুতরাং বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ পরিকল্পনা প্রণয়নে এ বিষয়গুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করা হয় না। এ কারণে সমন্বিত বাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এসব অদৃশ্য সমস্যাগুলোকে অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রয়েছে প্রচুর অনিশ্চিয়তা। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধারাবাহিকভাবেই অনিশ্চিয়তার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হয়। পরিকল্পনা প্রণয়ন যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পুনর্গঠন। যে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা একান্তই প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে– এই সমস্যাগুলো হয় অদৃশ্য সমস্যা। অদৃশ্য সমস্যাগুলো উন্নয়নের গতিকে নিচের দিকে টেনে ধরে। এতে উন্নয়ন যেমন টেকসই হয় না তেমনি কল্যাণরাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ,
গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।











