সাদা বাঘ

রেজাউল করিম

বুধবার , ২৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
30

বনের রাজা বাঘ। বনের প্রায় সব প্রাণি তাকে ‘বাঘমামা’ বলেই ডাকে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলে কথাই নেই। ‘সব শুনে বাঘ বলে সাহস তো কম নয়/ আমার হুকুম ছাড়া কোন ব্যাটা বনে রয়/ শেয়াল কুলকে বলে, ভাগ্নেরা শোন তো/ কোথাকার বিল্লু সে ধরে নিয়ে আয় তো/ হাজির হল সে মেনি ব্যাঘ্রের সামনে/ বাঘ দেখে বলে কিনা, আমি ভয় পাইনে/ বনের রাজা যে হবে সে কেমন পোক্ত?/ একবার মোর সাথে মোকাবিলা কর তো।’
রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রঙ কি? হলুদের উপর কালো ডোরা কাটা। সাদা রঙের বাঘও কিন্তু আছে। এই জাতের বাঘের বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্থেরা টাইগ্রিস । তাদের শরীরের সাদা লোমের কারণ ফিওমেলানিনের অনুপস্থিতি। এটির উপস্থিতির কারণে অন্যান্য রয়েল বেঙ্গল বাঘের লোম সাধারণত কমলা বা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। অন্যান্য রয়েল বেঙ্গল বাঘের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, সাদা বাঘ তুলনামূলকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তাদের ওজনও হয় বেশি। জন্মের সময়ও তারা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বড় থাকে। ২-৩ বছর বয়সে সাদা বাঘ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। সাদা পুরুষ বাঘ সাধারণত ওজনে ২০০ থেকে ২৬০ কেজি এবং দৈর্ঘ্যে ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। জেব্রার মত সাধা বাঘেরও সাদা-কালো দাগগুলো আঙুলের ছাপের মত অনন্য হয়ে থাকে। এই বাঘের সাথে অন্য কোন বাঘের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু কেন তাদের রঙ সাদা? সাদা রঙের ওপর কালো ডোরাকাটা বাঘ এখন দুর্লভ। হলুদ বা কমলা রঙের ওপর কালো ডোরাকাটা বাঘই এখন চোখে পড়ে। বাঘের এই রঙের পার্থক্যের কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন চীনের একদল বিজ্ঞানী। তাঁরা দেখেছেন, একটি জিনের (বংশগতির নিয়ন্ত্রক) সামান্য পার্থক্যের কারণেই বাঘ কখনো সাদার ওপর ডোরাকাটা, কখনো বা কমলার ওপর ডোরাকাটা হয়ে থাকে। কমলা বাঘের মতো সাদা বাঘও বেঙ্গল প্রজাতির। একসময় আসাম, বাংলা ও বিহারে দুর্লভ সাদা বাঘের দেখা মিলতো। চীনের বিজ্ঞানীরা জানান, কোনো প্রাণীর শরীরের রঙের জন্য দায়ী জীবদেহের কোষের স্বাভাবিক রঞ্জন বা পিগমেন্ট। এটা মানুষসহ প্রায় সব প্রাণীর মধ্যেই থাকে। এই কোষের জিনের সামান্য পার্থক্যেই বাঘের শরীরের রং পরিবর্তন হয়। পিকিং ইউনিভার্সিটির সু-জিন লুয়ো ও তাঁর দলের গবেষণার প্রতিবেদনটি কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়েছে।
পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী সু-জিন লুয়ো ও তার সতীর্থরা পরীক্ষা করে দেখেছেন জিনের একটি বিশেষ রঞ্জক পদার্থের পরিবর্তনই এই সাদা রঙের জন্য দায়ী। বিজ্ঞানীদের মতে কোনো প্রাণীর কোষের স্বাভাবিক রঞ্জক পদার্থই দেহবর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা সাদা বাঘের দেহকোষের জিন পরীক্ষা করে দেখেছেন কোষের মধ্যে বিশেষ রঞ্জক জিন ‘এসএলসি৪৫এ২’ আছে। বিশেষত মানুষসহ ঘোড়া, মুরগি ও মাছের দেহের হাল্কা রঙের জন্যও এই রঞ্জক পদার্থটি দায়ী। এই বিশেষ রঞ্জকটি কালো-হলুদ রঙ তৈরিতে বাধা দেয়। কিন্তু সাদা বাঘের গায়ে হাল্কা কালো ডোরার কারণ ‘এসএলসি৪৫এ’ জিনের মধ্যে ‘এ৪৭৭ভি’ নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবর্তন। সম্প্রতি ‘কারেন্ট বায়োলজি’ নামক একটি জার্নালে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করেছেন। মেন্ডেলের সূত্র অনুযায়ী জিনের ভিন্নধর্মী উপাদানের মধ্যে যেটি প্রকাশিত হয় না তাকে প্রচ্ছন্ন উপাদান বা ‘রিসেসিভ ফ্যাক্টর’ বলে। অর্থাৎ সাদা বাঘের ক্ষেত্রে হলুদ রঞ্জক সৃষ্টিকারী জিনটি প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন বাঘের দেহবর্ণ সৃষ্টিকারী রঞ্জক দুটি হলো ফিওমেলানিন ও ইউমেলানিন। এদের মধ্যে কালো-হলুদ রং তৈরি করে ফিওমেলানিন রঞ্জক। কিন্তু সাদা বাঘের ক্ষেত্রে এই রঞ্জক তৈরির প্রক্রিয়াটি অ্যামাইনো অ্যাসিড পরিবর্তনের ফলে বা ‘পয়েন্ট মিউটেশন’-এর কারণে রাসায়নিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সাদা বাঘ এখন বিলুপ্ত প্রায়।
একটা সাদা বাঘ জন্মের জন্য মা ও বাবা উভয় বাঘকেই সাদা রঙের হতে হবে। ১০০০০ বাঘ জন্মের ক্ষেত্রে কেবল একটি বাঘ প্রাকৃতিকভাবে সাদা রঙের হয়ে থাকে। কিছু সাদা বাঘ ডোরাহীন হয়। এদেরকে স্নো হোয়াইট টাইগারও বলা হয়।
বাঘদের ডোরাকাটা দাগ এদের চামড়ার মধ্যেই থাকে। তাই একটা সুস্থ বাঘের সব লোম চেঁছে ফেললেও এর ডোরাকাটা দাগ থেকেই যায়।
বর্তমানে বিশ্বে কয়েক শত সাদা বাঘের অস্তিত্বের খবর জানা গেছে, যার মধ্যে প্রায় একশটি রয়েছে ভারতে। তবে সাদা বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় ৩৪টি সাদা বাঘ রয়েছে। এখানে জন্ম হওয়া বেশ কয়েকটি সাদা বাঘ ভারতের অন্যান্য চিড়িয়াখানা এবং বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।
সাদা রঙের লোমের কারণে এ ধরনের বাঘ বেশ জনপ্রিয়। সাদা রঙের সাইবেরিয়ান বাঘের অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, যদিও বিভিন্ন সময় সাইবেরিয়া অঞ্চলে সাদা বাঘ দেখার খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় এবছরের ১৯ জুলাই ‘রাজ’ ও ‘পরী’ দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় একটি সাদা বাঘ। রাজ ও পরীকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কিনে আনা হয় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায়। এই সাদা বাঘটিই দেশের ইতিহাসে প্রথম সাদা বাঘ। এর কিছুদিন পর চলতি বছরের ৮ আগস্ট গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে জন্ম নেয় আরও একটি সাদা বাঘ। ‘ম্যাও বলে, মেনেছি তো শর্ত যেমন ছিল/ মানে হার বাঘরাজা, মুখ কোথা ঢাকবে/ মেনি বলে, ‘আজ থেকে ‘মাসি’ বলে ডাকবে।’ সাহিত্যিকরা বাঘকে ‘মামা’, ‘মাসি’ নানাভাবে সম্বোধন করেছেন।

x