বিআইটিআইডি হাসপাতাল

বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রাপ্তির নির্ভরশীল ঠিকানা

খন রঞ্জন রায়

শনিবার , ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ
181

চিকিৎসক শব্দটির মধ্যেই একটি মমত্ববোধ, মানবতাবোধ, সহমর্মিতার আভাস মেলে। বর্তমান আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি উৎকর্ষতার যুগেও চিকিৎসার ঠিকানা মানুষের সবচাইতে বড় বন্ধু। পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে গেল একশত বছর চিকিৎসা, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিষ্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতাল চালু হয় তখন সারা পৃথিবী হৈ চৈ পড়ে যায়। যদিও ৪০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও লিপিবদ্ধ তথ্যের আলোকে হিপোক্রেটিসকে চিকিৎসা শিক্ষার জনক বলা হয়। তখন ব্যক্তিগত, একক হিসাবে একজন একজন ধরে চিকিৎসা প্রদান করা হতো। সকল ধরনের রোগবালাই ও দুরারোগ্য রোগিদের একটি নির্দিস্ট জায়গায় ভর্তি রেখে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সমন্বয়ে সম্মন্বিত চিকিৎসা শুরু কিন্তু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই।
৯ম শতাব্দীতে আলরাজী, ১৩শ শতাব্দিতে মরক্কো, কায়রো, বাগদাদ, মিশরে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু হতে থাকে। মিশরে তখন ৮ হাজার শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে রোগি ভর্তি হতো। হাসপাতালেই স্থাপন করা হয়েছিল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোড়া, মঠ ইত্যাদি উপসনা, প্রার্থনার সুযোগ সুবিধা। তখন পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষ করে ইউরোপেও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত কিছু রোগিকে দুর্গম স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেই সব হতভাগ্যদের মৃত্যু পর্যন্ত ওখানে থাকতে হতো। চিকিৎসা নিয়ে কুসংস্কার যদিও এখনো প্রচলিত আছে। উন্নতমানের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা প্রদানের কারণে এখন সাধু, সন্ন্যাসী, সমাধি, মাজার, গীর্জায় রোগাক্রান্তদের আনাগোনা অনেকটাই কমে এসেছে।
১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন পোপ ইনোসেন্ট, সেখানে চিকিৎসা প্রদানের অন্যতম অনুসঙ্গ হিসাবে মিউজিক্যাল থেরাপি, অকোপেশনাল থেরাপি, সংগীত, কৌতুক, গল্পের মাধ্যমে মানুষকে মুগ্ধ করে সুস্থ করে তোলা হতো। ক্রসেডযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত ইউরোপে ১২৫৪ খ্রিস্টাব্দে লে ক্যাশম্যান ফ্রান্সের প্যারিসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৫১৮ সালে চিকিৎসা প্রদানের পূর্বে পরীক্ষা নিরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়। ১৮৭৭ সালে স্কটল্যান্ডের কৃতি চিকিৎসক স্যার প্যাট্রিক ম্যানসন ট্রপিক্যাল মেডিসিন চিকিৎসার গোড়াপত্তন করেন।
মূলত এরপর থেকেই চিকিৎসাকে আলাদা বিজ্ঞান হিসাবে দেখতে শুরু করা হয়। এই বিজ্ঞানের মৌলিক ৮টি বিষয় অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি, ফরেনসিক ও মেডিসিন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নতি ঘটতে থাকে। উন্নতমানের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে এই শিক্ষা বাংলাদেশেও প্রভূত উন্নতি ঘটানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১০৬ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারি ৩১, বেসরকারি ৬৯, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ০৬, এর বাইরে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৫ ডেন্টাল কলেজ ও ২১টি ডেন্টাল শিক্ষা ইউনিট চিকিৎসক তৈরিতে কাজ করছে। মানসম্পন্ন মেডিক্যাল শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ইতিমধ্যে ০৩ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিরীক্ষণ বা তদারকি করছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে জাতির সামনে ওয়াদাবদ্ধ হয়ে আছেন প্রতি বিভাগে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতি জেলায় একটি করে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন।
বর্তমানে দেশে উপজেলা, জেলা, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা শিক্ষার সরকারি বেসরকারি সব মিলিয়ে রয়েছে ৫৮১৬ টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, মোট শয্যা সংখ্যা- ৩১ হাজার ২৬০টি। প্রতি বছর কেবল সরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের চিকিৎসা গ্রহণ করে প্রায় চার কোটি রোগি। আদিকাল থেকে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ও কর্র্তব্য পালন করে সরকার। আমাদের দেশেও সীমিত সাধ্যের মধ্যে সরকারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবাখাত খুব দ্রুত উন্নতি করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ তাদের গবেষণায় জানিয়েছে স্বাস্থ্যসেবার মান ও সূচকে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের উপরে। অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও বাংলাদেশের এই খাতের সাফল্যের কথা জোড়ালোভাবে ওঠে এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবা উন্নতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি হাসপাতাল। ইদানিং বলা হয়ে থাকে বিশেষায়িত হাসপাতাল। দেশে এখন যুগোপযোগী পরিপূর্ণ বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে সরকারিভাবেই ১২টি এর প্রায় সবগুলোই ঢাকাতে। এগুলো হলো- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ও বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পূণর্বাসন প্রতিষ্ঠান, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট হাসপতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সস ও হাসতাপাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল-খুলনা, শেখ ফজিলাতুন মুজিব চক্ষু হাসপতাাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান- গোপালগঞ্জ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ ডিজিজেস ও রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল- মহাখালী, নাক কান গলা- বিশেষায়িত হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটি অ্যান্ড সোসিয়েল মেডিসিন ইত্যাদি।
আনন্দের কথা, একামাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস, বিআইটিআইডি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে চট্টগ্রামে। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা ও ভৌগলিকভাবে নাতিশীতোষ্ণ আঞ্চলিক অবস্থানগত কারণে এখানে বিশেষ কিছু ট্রপিক্যাল সংক্রামক ব্যাধির প্রার্দুভাব বেশি। টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কুষ্ঠ, যক্ষা, কালাজ্বর, বার্ড-ফ্লু, এইডস, এইচআইভি ইত্যাদির ঝুঁকি সামগ্রিক স্বাস্থ্য কাঠামোতে প্রভাব ফেলে।
বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহ অপ্রতুলতা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অবকাঠামোগত দুর্বলতা আমাদের দেশে ডায়রিয়া, বমি, পেটেব্যাথা, ক্ষুধামন্দা, জন্ডিস, রক্তশূণ্যতা, শ্বাসকষ্ট, কাশি, মাথাব্যাথা, বুক ব্যাথা, বুকধর ফর করা, ওজন বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, গিলতে কষ্ট হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাব কমে যাওয়া, পা ফুলা, প্রস্রাবেজ্বালার মাত্রাতিরিক্ত ঘটনা তো আমাদের চলতেই থাকে। আমাদের দেশের জলবায়ুর পরির্বতন ও তাপমাত্রা সহনশীল আকারে পরিবর্তন হয় বলে আমরা ট্রপিক্যাল দেশের কাতারে পরি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশ রয়েছে এই অবস্থানে। আমাদের সীমান্ত সংযোগ, বন্দর ব্যবহারে নানান দেশের বহুমাত্রিক মানুষের অবাধ আনাগোনার কারণেও ট্রপিক্যাল রোগসমূহের আক্রমণ চট্টগ্রামের এলাকা অত্যাধিক ঝুঁকিতে।
প্রান্তিক আঞ্চলিক ঝুঁকি মোকাবিলা, দেশের মানুষকে স্বাস্থ্য স্বস্তি, এ সমস্ত রোগসমূহের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ নিবিড় গবেষণা কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যই এই বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটের যাত্রা। ২০০৭ সালের পরিকল্পনা ২০০৯ সালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানুয়ারি ২০১৩ সালে পরিকল্পিত ১০ তলা ভবনের ৪র্থ তলা পর্যন্ত সম্পন্ন নির্মাণে হাসপাতাল কার্যক্রমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রস্তাবিত ৩০০ শয্যার এই বিশেষায়িত হাসপাতাল বর্তমানে ১২০ শয্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সাথে মিলিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। সর্বাধুনিক চিকিৎসাপ্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য এই হাসপাতাল বর্তমানে পরিচালক হিসাবে পরিকল্পনা গবেষণা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে প্রশাসনিক দৃঢ় ভূমিকা রাখছেন দেশের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল হাছান চৌধুরী (এম এ হাছান চৌধুরী) গৌরব ও গর্বের সাথে বলতে হয় এখানের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে আন্তর্জাতিকমান। দেশের একমাত্র হাসপাতালে কর্মরত সকল শ্রেণির চাকুরিজীবীদের নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার তদারকি ও সহায়তাতে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটিয়েছেন উপ পরিচালক ডা. মো. হোসেন রশীদ চৌধুরী।
ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদের সার্বিক নিপুন তত্ত্বাবধানে জরুরি বিভাগ, বহিঃবিভাগ ও আন্ত:বিভাগে টিটেনাস, ডায়রিয়া, জলাতংক, হাম, বসন্ত, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস, কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের বিজ্ঞানভিত্তিক সু চিকিৎকসায় আন্তরিকতা প্রদর্শনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ২৯ জন চিকিৎসক, ৪৮ জন নার্স, ১০ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবাকর্মীর আন্তরিক নিষ্ঠায় আগত রোগিদের প্রত্যাশিত সেবা প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখছে।
সরকারি ল্যাব যেটি আইএসও’র সনদ প্রাপ্তির প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক সকল মানদণ্ড অতিক্রম করা হয়েছে। অপেক্ষা কেবল সার্টিফিকেট অর্জন। সরকারি যথাযথ উদ্যোগ ও লক্ষণীয় সুদৃষ্টির সাথে এখানে সম্পৃক্ত হয়েছে ফ্রান্সের মানবতাবাদী দানশীল মেঁরিও ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশন কম্বোডিয়া, মালি, ফ্রান্স, লেবানন, মাদাগাস্কার, লাউস, হাইতি, ব্রাজিলসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশে আন্তর্জাতিকমানসম্পন্ন ব্যায়বহুল বায়োসেফটি ল্যাব পরিচালনা করছে। তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যা রোডলফ মেঁরিওল্যাব নামে প্রান্তিক জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোড়গোঁড়ায় পৌঁছে দেয়ার যে ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা সরকারের, তার ওতোপ্রোত প্রতিফলন এই বিশেষায়িত হাসপাতাল। দেশের আপামর জনসাধারণ বিশেষ করে বেশি সুবিধাভোগী চট্টগ্রামবাসীর নিকট উদাত্ত আহবান, আসুন আমরা সংক্রামক ও ট্রপিক্যালব্যাধি রোগ প্রতিরোধে সচেতন হই, প্রয়োজনে বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত স্বয়ংসম্পূর্ণ এই হাসপাতালের বিশ্ব স্বীকৃত সেবা গ্রহণ করি।

x