জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
36

ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতদারিতা
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য,যিনি তাঁর বান্দাদের ওপর আমানতদারিতা রক্ষা করা ফরজ করেছেন। পক্ষান্তরে প্রতারণা আত্মসাৎ ও বিশ্বাস ঘাতকতা নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের সরদার, আমাদের মহান নবী, আমাদের অভিভাবক, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। যাঁকে প্রেরণের মধ্যে দিয়ে রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। তাঁর পরিবার পরিজন সম্মানিত বংশধরগন, ন্যায় পরায়নতার গুণে গুনান্বিত সম্মানিত সাহাবাগণ সকলের উপর অসংখ্য অফুরন্ত করুণাধারা বর্ষিত হোক।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আপনারা মহান আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন। যিনি আপনাদের উপর গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন ও এর জবাবদিহিতা অপরিহার্য করেছেন। আমানতদারিতা একটি মহৎ গুণ। প্রতিটি বিষয়ে আমানতদারিতা রক্ষার জন্য ইসলামে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেন “ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানত তার মালিককে প্রত্যার্পন করো। (সুরা: নিসা :৫৮) তোমরা সেই আমানত কে প্রত্যার্পন করো যা আল্লাহ তা’য়ালা আকাশ মন্ডলী ভূমন্ডল ও পর্বতমালার নিকট পেশ করেছে যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন “ আমি এই আমানতকে (কুরআন) আকাশমন্ডলী, জমিন, পর্বতমালার নিকট পেশ করলাম। কিন্তু তারা এর বোঝা বহন করতে রাজি হলো না বরং তারা ভয় পেয়ে গেল। আর মানুষ তাকে নিজের ঘাড়ে তুলে নিল, নিশ্চয়ই মানুষ বড়ই অত্যাচারী ও মুর্খ । সূরা আল আহযাব:৭২
তোমাদের প্রতি আল্লাহ যত ইবাদত ও বান্দার হক আমানত হিসেবে আদায় করা ওয়াজিব করেছেন তা আদায় করো।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আমানত খেয়ানত করো না। শরয়ী বিধানে সংযোজন ও বিয়োজন করে সীমালঙ্ঘন করোনা। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন, হে মুমীনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূল ও তোমাদের উপর ন্যস্ত আমানতের খেয়ানত করোনা। অথচ তোমরা এর গুরত্ব জান। (সূরা: আনফাল-২৭)
ইবাদত ও মুয়ামিলাত লেনদেনে আমানত সুরক্ষায় সচেষ্ট থাকুন, ইবাদতের ক্ষেত্রে একনিষ্টভাবে আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি আনুগত্য ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরন করুন। আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের আদেশ-নিষেধ মেনে চলুন।
আমানতদারিতা হচ্ছে জান্নাতের পথ, খেয়ানত হচ্ছে জাহান্নামের পথ। আত্মসাৎবিশ্বাস ঘাতকতার কারণে ঈমান ত্রুটি যুক্ত হয়। তা হচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতি, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার কারণ।
সম্মানিত শ্রোতা মণ্ডলী
নিশ্চয় পিতা-মাতা ও পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের নিকট সন্তান-সন্ততি এক পবিত্র আমানত। তাদের উন্নত উত্তম চরিত্র গঠন উত্তম ও কল্যাণকর কাজের প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধকরণ ও অনুপ্রাণিত করা পক্ষান্তরে মন্দ কাজ ও অপকর্ম বর্জনে তাঁদের তত্ত্বাবধান করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। ব্যবসা-বাণিজ্যে, ক্রয়-বিক্রয় ও লেনদেনে আমানতদারিতা রক্ষা করা ক্রেতা-বিক্রেতার উপর অপরিহার্য। ব্যবসার ক্ষেত্রে সত্য পন্থা অবলম্বন আবশ্যক। পণ্য বিক্রয়ে কোন প্রকার মিথ্যাচার করবেন না। পণ্যের মধ্যে বিদ্যমান কোন প্রকার দোষ ত্রুটি গোপন করবেন না। যে ব্যক্তি সততার ভিত্তিতে আমানতদারিতা রক্ষা করল সে সফলতা লাভ করলো। যে আমানদারিতা বর্জন করল সে হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হল। প্রত্যেক শ্রেণির দায়িত্বশীল মানুষ বিশেষ শ্রেণি হোক বা সাধারণ শ্রেণি হোক প্রত্যেককে স্বীয় দায়িত্ব পালন বা সম্পাদনে আমীন তথা বিশ্বস্ত হতে হবে।
আদালতের বিচারক এর বিচার কার্য তার জন্য আমানত। রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি শাসক তাঁর দায়িত্বে তাঁকে আমীন তথা বিশ্বস্ত হতে হবে। প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি এক এক জন আমানতদার। তাঁর সংশ্লিষ্ট কার্য বাস্তবায়নে তাঁকে পরিপূর্ণভাবে আমানতদার হতে হবে। আমানত দারিতার গুরুত্ব ও তাৎপর্য প্রসঙ্গে প্রিয় নবী রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন, যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই। (আহমদ হাদীস নং ১৩৫)
হযরত আবু হুরায়রা (র.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, মুনাফিকের তিনটি নিদর্শন রয়েছে।
১.কথা বললে মিথ্যা বলে, ২. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে , ৩. তার কাছে কোন কিছু আমানত (গচ্ছিত রাখা) রাখা হলে তা খিয়ানত করে (বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৬১৪২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যার কাছে চারটি অভ্যাস থাকবে সে খাটি মুনাফিক, যার নিকট এগুলোর একটি থাকবে তার নিকট নিফাকের একটি অংশ আছে। যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। ১. যখন তার নিকট কোন আমানত রাখা হয় তা খিয়ানত করে। ২. যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে। ৩. যখন ওয়াদা করে তখন তার বিপরীত করে। ৪. যখন ঝগড়া করে তখন গালমন্দ করে। (বুখারী হাদীস নং ৩৪, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৫৮)
অন্য সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যদি তোমার মধ্যে চারটি অভ্যাস থাকে তবে পার্থিব কোনো জিনিষ হাত ছাড়া হলেও তোমার ক্ষতি হবেনা, ১. আমানত হেফাজত করা, ২. সত্য কথা বলা, ৩. উত্তম চরিত্র, ৪. পবিত্র রিযক তথা হালাল রিযক। (আহমদ, বয়হাকী, হাদীস নং ৪৯৯৪)
সম্মানিত মুমীনগণ!
প্রত্যেক মানুষের নিকট খোদা প্রদত্ত সকল দান হচ্ছে আমানত। মানুষ হচ্ছে আমানতদার। যথার্থভাবে সে আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে চিন্তা শক্তি, ধারণ শক্তি, জ্ঞান শক্তি দান করেছেন। এসব কিছু হচ্ছে সৃষ্টির পূর্ণতা বিধানের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত আমানত। মানব জাতি যখন এ আমানত রক্ষা করে তখন সে ইনসানে কামিল হিসেবে গণ্য হয়। হযরত উবাদা বিন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা আমার কাছে ছয়টি বিষয়ের প্রতিজ্ঞা করো, আমি তোমাদের জন্য বেহেস্তের প্রতিজ্ঞা করবো। ১. তোমরা সত্য কথা বলবে, ২. ওয়াদা করলে তা পূর্ণ করবে, ৩. তোমার নিকট কোনো জিনিস আমানত রাখা হলে তা যথাযথ ফেরত দিবে, ৪. তোমার লজ্জাস্থানকে হেফাজত করবে ( অর্থাৎ অবৈধ মেলা মেশা থেকে নিজকে বিরত রাখবে), ৫. তোমার দৃষ্টিকে সংযত রাখবে, ৬. অন্যায় কাজ থেকে তোমার হাতকে বিরত রাখবে। (আহমদ)
তাওহীদ হচ্ছে আমানত, রিসালত হচ্ছে আমানত, কুরআন ও সুন্নাহর বিধান আঁকড়ে ধরা আমানত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ আমানত। সম্মানিত সাহাবাগণের যথার্থ মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমানত। রসুলুল্লাহর পবিত্র বংশধরগণের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা আমানত। আল্লাহ আমাদের আপনাদের সকলকে আমানত রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমানত বিনষ্ট করা ও খিয়ানত করা থেকে আমাদের কে হিফাজত করুন। আমাদের সকলকে কুরআনুল করীমের বরকত দান করুন। কুরআন মজিদের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। বিতাড়িত শয়তানের প্রতারণা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন তোমরা যেন আমানত তার মালিককে প্রত্যার্পন করো। (সূরা: আন-নিসা: আয়াত:৫৮)
লেখক : খতিব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ

x