আমার ছোটবেলা

তাফরিহা সাবা (৩২,০০২)

বুধবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
13

আমি ছোট। মায়ের ডায়েরি দেখেছি। জন্ম ১৩ অক্টোবর ২০০৮। চট্টগ্রাম শহওে একটি হাসপাতালে। এখন সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুলে ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমার ছোটবেলা চলছে। অতি ছোটবেলা এখন স্মৃতির পাতায়।
শৈশবকাল। রাতে ঘুমানোর পূর্বে প্রায় প্রতিদিনই আমাকে বারান্দায় বসে চাঁদের আলো দেখানো হতো। বাবা মহা উৎসাহ নিয়ে চাঁদ, তারা, আকাশ, গাছ-পালা, জীব-জন্তু এসব দেখাতেন। কাল্পনিক ও বাস্তব গল্প শুনাতেন। অনেক মজা পেতাম। বাবার প্রতিটি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। সেই থেকে আমার মনে মহাকাশ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু। এখন বুঝতে পেরেছি গল্পে গল্পে পাঠ্য বইয়ের গণিত ও বিজ্ঞানের অনেক বিষয় আলোচনায় আনতেন। ধারাবাহিক গল্প বলা শেষ হয় না। তাছাড়া বাবা গল্প ও ছড়ার বই কিনে দিতেন। নতুন বই না পেয়ে অনেক সময় উপরের ক্লাসের সাহিত্য ও আনন্দপাঠ সংগ্রহ করেছি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বইগুলো পড়তে আমার ভাল লাগে। আমার প্রথম লেখা কবিতা ছিল :
একদা জোৎস্না রাতে
বসেছি বারান্দাতে
বাবা ছিলেন পাশে
মাও ছিলেন কাছে।
চাঁদ দেখে মনটা করে কেমন
প্রাণটা করে কেমন
অতি ছোটবেলার কথা
আজো মনে গাঁথা।
আমাদের পরিবার যৌথ পরিবার। পরিবারের মধ্যে মেজ চাচা আমাকে সবচেয়ে বেশি আদর করতেন। তিনি পূরণ করতেন আমার রাজ্যের সব শখ। আমরা সকলে তাঁকে ‘লাল’ বলে ডাকতাম। আমার ধারণা পান খাওয়ার পর ঠোঁট ও জিহ্বা লাল হয়ে থাকতো বলে এই নামে ডাকা। তবে এখন ‘মেজ আব্বু’ বলে ডাকি। অসুখ-বিসুখ লেগে থাকত। বিশেষ করে জ্বর। জ্বরের সময় মেজ আব্বু বিভিন্ন ফলমূল আনতেন। কিছুদিন পর জ্বর থেকে ছাড়া পেতাম। সেই সময়টাতে ম্যাঙ্গোবার, চিপস্‌, আইসক্রিম ইত্যাদি আনতেন। আবার জ্বর চেপে ধরত। চিকিৎসার জন্য অনেকবার ঢাকা গিয়েছি। এভাবে জ্বর, ঢাকা-চট্টগ্রাম আসা-যাওয়া করতে করতেই পার হয়েছে আমার অতি ছোটবেলার কয়েকটি বছর।
অতি ছোট বেলায় যতটুকু মনে পড়ে আমি সম্ভবত কেজি শ্রেণিতে পড়ি। খেলনা, দোলনা, ওয়াকার সব ছিল। শান্তি মিলানোর জন্য যা যা দরকার তার চেয়ে বেশিই ছিল আমার। এছাড়া আরো একটি জিনিস খুব বেশি পেয়েছিলাম, তা হলো আদর। সম্ভবত বাবা মায়ের বড় সন্তান হিসেবে আমি অনেক যত্নে বেড়ে উঠেছি।
দুষ্টু ছিলাম। বোনের সাথে ঝগড়া হতো। অনিয়ম দেখলে মা শাস্তি দিতেন। তার পরেও মাকে ভয় লাগে না। বাড়ি ফিরলে বাবাকে অভিযোগ জানানোার কথা বলতেন। না বলার জন্য উল্টো জেদ ধরতাম। কারণ বাবা গম্ভীর হয়ে গেলেই ভয় লাগে। মাঝে মধ্যে বাবার ডায়লগ ‘শেষ পর্যন্ত বেত ধরতে হবে দেখছি’। সৌভাগ্য আমার, এ পর্যন্ত বাবার শাস্তি পাইনি।
মা যখন দাদুর সাথে ওমরাহ হজ করতে গিয়েছিলেন তখন আমাকে ও ছোটবোন রাহিকে বাবার সাথে রেখে গেলেন। তখন প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার করে চাচাতো ভাই-বোনসহ আমাদের শিশু পার্কে অথবা মেলায় নিয়ে যেতে হয়েছিল বাবাকে। সে সময়ের মজাটাই আলাদা।
প্রথম যে স্কুলে ভর্তি হয়েছি তার নাম ফুল ব্রাইট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। প্রিন্সিপাল ছিলেন আমার চাচাতো ভাইয়ের নানা ভাই। আমাকে বেশি আদর করতেন। আমাদের ক্লাসে স্টুডেন্ট ছিল ৭ জন। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল তাই বুঝি স্টুডেন্ট কম। কিন্তু এই সামান্য শিক্ষার্থীর মাঝে আমরা ছিলাম একে অপরের প্রাণের বন্ধু। ক্লাসে ছেলে-মেয়ে কোন ভেদাভেদ ছিল না। ছুটির পর মা নিতে আসতে দেরি হলে স্কুল প্রাঙ্গনে খেলার সুযোগ হতো। খেলতে গিয়ে ছোট ক্লাসের অনেকের সাথেও বন্ধুত্ব হয়েছিল। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠে স্কুল বদলানোর কারণে আসমা, নুসাইবা, ইসমিতা, আসাদ, ওয়াসিফানদেরকে ফেলে আসতে হয়েছে। হয়তো আর দেখা হবে না। স্কুলের অধ্যক্ষ প্রিয় নানুভাই গত বছর আমাদের ছেড়ে পরকালে পাড়ি জমিয়েছেন। বার বার মনে পড়ে সেই স্কুল ও স্টুডেন্টদের কথা। তাদের কখনও ভুলতে পারব না।
ঈদে-পার্বণের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে যাই। চকরিয়া থানার কৈয়ারবিল গ্রামের পাশে মাতামুহুরী নদী। সেখানে গ্রামের প্রকৃতি, পুকুরে সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানোর সুযোগ, বাঁধাহীন চলাফেরা, আরো কতকিছু! তখন ইচ্ছে করে বাবাদের মতো পুরো শৈশবকাল গ্রামে থাকলে কতই না ভালো হতো।
২৬ সেপ্টেম্বর ’১৮ দৈনিক আজাদীতে আমার আঁকা ছবি আমাকে অনেক উৎসাহ জুগিয়েছে। পত্রিকায় ছাপাবে এ আশায় এবার লিখে ফেললাম ‘আমার অতি ছোট বেলা’।

x