হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছয় মাসের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ৭ হাজার। সরকারি হিসেবে এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। এ বিষয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। হামের প্রকোপ বাড়ার কারণে প্রথমে শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ১৬ বেডের হাম কর্নার চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে রোগী আরো বাড়ার কারণে ৫০ শয্যার হাম ব্লক চালু করা হয়। বর্তমানে এসব শয্যার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। এছাড়া হাম উপসর্গের রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১০ শয্যার পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক আইসিইউ) সব সময় পূর্ণ থাকছে। এদিকে, হাম নিয়ন্ত্রণে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী দ্বিতীয় দফায় হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এর আগে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হাম–রুবেলার টিকা দেয়া হয়। মাসব্যাপী চলা সেই ক্যাম্পেইনে চট্টগ্রাম উপজেলা ও নগরীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে হাম–রুবেলার টিকা দেয়া হয়েছিল।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ছোঁয়াছে রোগ হওয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি কোনো শিশু যদি হাম আক্রান্ত হয়েও থাকে, তার সংস্পর্শে অন্য শিশু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তবে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত বেডের মধ্যে তারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে আসা বেশিরভাগ শিশুর বয়স ২ বছরের কম। এরমধ্যে আবার অনেক শিশুর টিকা দেয়ার বয়সও হয়নি। আবার অনেক শিশুকে হামের টিকা দেয়নি, অনেকে এক ডোজ দিয়েছে। একদমই দেয়নি এরকম শিশুও রয়েছে।
কেন বাড়ছে হামের রোগী! স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও শিশু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদনে বলেছে, মূলত পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ঔষধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া হামের জন্য যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেই টিকার মান এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকা দেওয়ার কারণে ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন নতুন করে হামের প্রকোপে ভূমিকা রেখেছে কি–না সেই প্রশ্নও উঠছে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি কারণ রোগটিতে আক্রান্ত হলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং সে কারণে নিউমোনিয়ায় ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্লেষকরা বলেন, সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায়গুলি পোস্টারের মাধ্যমে এবং মাইকিং করে হাটে বাজারে, জনসমাবেশ স্থলে, ওয়াজ মাহফিলে, স্কুল কলেজে প্রচার করতে হবে। কিছুটা হলেও বিনাপয়সায় স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করা যায় উপায় বলে দিতে হবে। টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাধ্য করতে হবে। একটা শিশুর আসল মৃত্যু কিংবা চিকিৎসা করতে গিয়ে একটা পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় অবহেলারই সামিল। সাধারণভাবে চিন্তা করলে টাকার অভাবে সময়মত চিকিৎসা করাতে না পেরে, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দিনের পর দিন রোগে ভুগতে ভুগতে যে শিশুটা মারা গেল এটা কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। সে যদি সময় মতো চিকিৎসা পেত ও পুষ্টি পেত সে ঠিক সেরে উঠতো জীবন ফিরে পেতো। তাঁরা বলেন, সামগ্রিকভাবে যে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, তাতে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও ছড়াতে পারে। তাই নজরদারি শক্তিশালী করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও মোকাবিলা করা এবং ভালো মানের টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। চমেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে যেভাবে নির্ধারিত সংখ্যার রোগীর চাপ বাড়ছে, তাতে পর্যাপ্ত সেবা প্রদান চ্যালেঞ্জিং। তবু আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার জন্য সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি।








