হাম প্রতিরোধে মাসব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শেষেও চট্টগ্রামে হাম পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এখনো প্রতিদিন সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে গড়ে ৫০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তবে এদের মধ্যে অনেক শিশু পরীক্ষার বাইরে থাকায় হামের সঠিক চিত্র উঠে আসছে না। বিশেষ করে অনেক শিশু উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হলেও পরীক্ষা না হওয়ায় তাদের হাম হয়েছে কিনা তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কক্সবাজার–ফেনীর হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে চমেক হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ জন। এদের মধ্যে পরীক্ষায় ৬১ জনের নিশ্চিত হাম ধরা পড়ে। এছাড়া ৭ জন নিশ্চিত হামে মারা যান। তবে এরমধ্যে অনেক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেও পরীক্ষা না হওয়ার কারণে তাদের আদৌ হাম হয়েছে কিনা সেটি নিশ্চিত নন চিকিৎসকরা। কারণ হামের অন্যতম প্রধান উপসর্গ র্যাশের সাথে নিউমোনিয়া। এখন কোন শিশুর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়েছে, আর কার হামের কারণে নিউমোনিয়া হয়েছে, সেটি পরীক্ষা না করে বলা যায় না। তাদের মৃত্যু সনদে শিশুদের জ্বর পরবর্তী র্যাশ ও নিউমোনিয়ায় মারা গেছে বলে চিকিৎসকরা উল্লেখ করে দিচ্ছেন।
চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে আসা মোট রোগীর ৫০ শতাংশ কক্সবাজার অঞ্চলের। এছাড়া চট্টগ্রামে উপজেলার মধ্যে বাঁশখালীর রোগী বেশি। এছাড়া নগরীর মধ্যে বায়েজিদ ও বাকলিয়া এলাকার রোগী বেশি আসছে। এদিকে চমেক হাসপাতাল ছাড়াও হামের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বিআইটিআইডি হাসপাতাল, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে গতকাল উপসর্গ নিয়ে আরো ৬০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬৫ জন ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ২ হাজার ২৭৪ জন নগরীর এবং ৯১ জন উপজেলার। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজর ৮৯ জনের। এখন পর্যন্ত মোট হাম আক্রান্ত হয়েছে ১৫৬ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়ে মারা গেছে ৩ শিশু। গতকাল ঢাকায় পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে ৪২ জনের। সব মিলিয়ে মোট নমুনা পাঠানো হয়েছে ১ হাজার ৪১৮ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি–হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। তবে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খায় এবং ভিটামিন ‘এ‘ ঘাটতি নেই তাদের হাম হওয়ার সম্ভাবনা কম। হাম প্রতিরোধের জন্য শিশুদের অপুষ্টি রোধ করা জরুরি। হাম এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। যাদের ভিটামিনের ঘাটতি হয় এবং অপুষ্টিতে ভোগে তাদের হাম হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। নিয়মিত চিকিৎসায় বেশিরভাগ শিশু ভালো হয়ে যায়। হাম ছোঁয়াছে হওয়ার কারণে রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হামের টিকার ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হামের টিকা দেয়া হয়েছে। বাদ পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুজে খুঁজে টিকা দেয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে এখনো অনেক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তাদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, আমাদের হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ শিশু টিকা নেয়নি। আবার কিছু শিশুর টিকা নেয়ার বয়স হয়নি, আবার কিছু শিশু এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। আবার দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এমন শিশুও আছে। আমাদের হাসপাতালে আজকে (গতকাল) চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২১ শিশু। এরমধ্যে হাম কর্নারে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৯১ শিশু, হাম ব্লকে ১৫ জন এবং আইসিইউতে আছে ১৫ শিশু।
সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবিস্থত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, হামের উপসর্গের দিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে যদি কোনো শিশুর জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং র্যাশ আসে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই রোগে নিউমোনিয়াও হতে পারে। বাসায় নিয়ে বসে থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।









