হল্যান্ড থেকে

হল্যান্ড থেকে ফিরে এসে: ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট এবং যত কথা

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ

১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। কে না শুনেছে লন্ডনের বুকে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সরকারি বাসভবন এবং কার্যালয়ের কথা। তিন শত বছর পুরানো এই ভবন দেশের কত রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী। কেবল দেশের কথাই কেন বলি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ঘটনাপ্রবাহে এই ভবন আরো কত ঘটনার সাক্ষী। এই ঐতিহাসিক ভবনটিতে যে সকল বিশ্ব নেতা ও ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম: রাণী এলিজাবেথ ও তার স্বামী ফিলিপ, দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন এবং ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি। ভবনে রক্ষিত দর্শনার্থী বই‘-এ নেলসন ম্যান্ডেলা লিখেছিলেন, ‘১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট পরিদর্শন করা সবসময়ই এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। দেশের কত প্রধানমন্ত্রী এই সরকারি বাসভবনে এলেন, আর গেলেন। নিয়মানুসারে এক নাগাড়ে ৫ বছর বসবাস করার নিয়ম থাকলেও রাজনৈতিক উথালপাতালে, রাজনীতির চালে সবার সে সৌভাগ্য হয়নি। ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, সব চাইতে দীর্ঘকাল এই ইতিহাসসাক্ষী ভবনে ছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী তিনি হলেন রবার্ট ওয়ালপোল। তিনি এই সরকারি বাসভবনে ছিলেন ২১ বছর (১৭২১১৭৪২)। সব চাইতে কম থেকেছেন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস, ২০২২ সালে, মাত্র ৭ সপ্তাহ। এই পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২৬ পর্যন্ত ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে মোট ৫৯ প্রধানমন্ত্রী বসবাস করেছেন এবং অফিস করেছেন। এর মধ্যে মাত্র ৩ জন ছিলেন মহিলা। তারমধ্যে অন্যতম হলেন, আয়রন লেডি হিসাবে পরিচিত মার্গারেট থেচার। আর একজনের নামতো ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, লিজ ট্রাস। বাকিজন হলেন থেরেসা মে। এনারা তিন জনই ছিলেন টোরি অর্থাৎ কনজারভেটিভ দলের। ১৯৭৯ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে মার্গারেট থ্যাচার ১১ বছর ২০৮ দিন ক্ষমতায় ছিলেন, যা তাকে ব্রিটিশ ইতিহাসের ৭ম দীর্ঘতম এবং বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রীতে পরিণত করে। তিন দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ১৯৯০ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব ত্যাগ করেন। ব্রিটিশ জনগণের কাছে মার্গারেট থ্যাচারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল এবং তিনি ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ নির্বাচনে ভোটে জয়ী হন। তবে নানা কারণে তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।

(দুই) ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যকাল বাইরে থেকে দেখে কোনভাবেই বুঝার উপায় নেই যে এর ভেতর প্রায় ১০০টি কামরা রয়েছে। এর তৃতীয় তলায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একটি ব্যক্তিগত বাসভবন, বেসমেন্টে রান্নাঘর। অন্যান্য তলায় অফিস, সম্মেলন কক্ষ, অভ্যর্থনা, বসার এবং ডাইনিং রুম। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী সরকারি মন্ত্রী, জাতীয় নেতা, বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেন। বাকিংহাম রাজপ্রাসাদ থেকে মাত্র ১,২ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটির বর্তমান অধিবাসী হলেন, সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহাম। তিনি স্থলাভিষিক্ত হলেন ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের। বেচারা কিয়েরমারের কপাল মন্দ। দুবছর আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা তার দল, লেবার পার্টিকে ‘ল্যান্ডস্লাইডবিজয় এনে দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন। কিন্তু গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসাবে পরিচিত ব্রিটিশ রাজনীতিতে কখন যে কার গদী যায় তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সামান্যতম ভুলে যেতে পারে ক্ষমতা। সে নিজের করা ভুল না হলেও। যেমনটি ঘটেছে স্যার কিয়েরমারের ক্ষেত্রে। তার বিশ্বস্তভাজন পিটার ম্যান্ডেলসনকে তিনি আমেরিকায় যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ম্যান্ডেলসনের সাথে কুখ্যাত আমেরিকার এপস্টেইন সেক্স কেলেঙ্কারিরযোগসাজশের অভিযোগ ছিল। সেই যে শুরু কিয়েরমারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, তারপর সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ উঠে, অভিযোগ আনা হয় তিনি অবৈধঅভিবাসন বন্ধ বা সীমিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন কট্টর ডান রাজনৈতিক দল, রিফর্ম ইউকে এবং এর নেতা নাইজেল ফারাজকে রাজনৈতিকভাবে ঠেকাতে। নিজ দলের মধ্যে এমন কী বেশ কয়েক মন্ত্রী তার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ায় এবং এক পর্যায়ে তারা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের অভিযোগ, স্যার কিয়েরমারের নেতৃত্বে আগামী জাতীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি রিফর্ম ইউকেকে ঠেকাতে পারবে না। তাই বৃহত্তর স্বার্থে তাকে (কিয়েরমার) ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। গদীর মায়া বড় মায়া। কেউ কি আর সহজে ছাড়তে চায়? চাননি স্যার কিয়েরমারও। তিনি বলেছিলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন। চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারলেন না। তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র এন্ডি বার্নহ্যাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদের জন্যে দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে তাকে প্রথমে এম পি পদে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। তিনি তাই করলেন। মেয়র পদে ইস্তফা দিয়ে উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হলেন। বেচারা ষ্টার কিয়েরমার। তিনি দেখলেন তার আর কোন পথ খোলা নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং ঘোষণা দিলেন, নূতন প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহ্যামকে সকল সহযোগিতা দেবেন। বললেন, ‘আমার কাছে দলের স্বার্থ ব্যক্তি স্বার্থের চাইতে বড়। এছাড়া তার আর বলার কীইবা থাকতে পারে।

তিন) এন্ডি বার্নহ্যাম বেশ ঘটা করে এলেন পার্লামেন্ট ভবনে। শপথ নিলেন। তারপর নিয়মমাফিক দেখা করতে গেলেন ব্রিটিশ রাজা চার্লসের সাথে। তার আগে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার রাজার সাথে সাক্ষাৎ করে তার পদত্যাগ পত্র জমা দেন। এর সাথে সমাপ্তি ঘটে স্যার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বকাল। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি বিরাগভাজন হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সুযোগ পেলেই ট্রাম্প স্টারমারের সমালোচনা করতে ভুলতেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের উপর ক্ষেপার কারণ তিনি (স্টারমার) ইরান আক্রমণে যুক্তরাজ্যকে জড়াতে রাজি হননি। এই ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনড়। ঠিক ভূতপূর্ব ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের উল্টো। টনি ব্লেয়ার ইরাক আক্রমণে সঠিক প্রমাণাদি না থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশের ডাকে সাড়া দিয়ে যুক্তরাজ্যকে মধ্যপ্রাচ্যযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। অন্যদিকে, স্যার কিয়ের স্টারমার দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ (ইরান আক্রমণ) আমাদের যুদ্ধ নয়। আমার কাছে আমার দেশ ও জনগণের স্বার্থ সবচাইতে প্রথম।এখন তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীদের তালিকায় স্থান পেলেন। পুরো টার্ম শেষ হবার অর্ধেকেরও কম সময়ের আগে তাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হলো। এমন বিদায় অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বেদনাদায়ক। তাই দেখা যায়, ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে তার পদত্যাগের ঘোষণা দেবার সময় তিনি কিছুটা ভেংগে পড়েন। দৃশ্যটি দেখতে আমারও কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে ওনাকে প্রথম দর্শনে খুব একটা ইমেপ্রসিভ মনে না হলে একটা সময় এসে তার কার্যকলাপ ভালোই লাগছিল। দেশের অর্থনীতি উন্নতির দিকে যাচ্ছিল, অবৈধ অভিবাসন অনেকটা কমিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু ততদিনে দলের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অনেকে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিলেন। এমন কী যাদের তিনি আপন ভেবে মন্ত্রীসভায় আসন দিয়েছিলেন তাদেরও কয়েকজন।

চার) কথায় আছে রাজা যায়, রাজা আসে। ঠিক তেমনি যুক্তরাজ্যের মত গণতান্ত্রিক দেশে প্রধানমন্ত্রী যায়, প্রধানমন্ত্রী আসে। স্যার স্টার কিয়েরমার গেলেন, এলেন এন্ডি বার্নহ্যাম। এসেই তিনি কিছু চমক দেখালেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের সকল মন্ত্রী ও কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলেন। গঠন করলেন নিজ পছন্দের নূতন মন্ত্রিসভা। দলের যে সমস্ত নেতারা তাকে স্টারমারের বিরুদ্ধে লড়তে সমর্থন দিয়েছিলেন, তার প্রতি সমর্থন দিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন এবং যার ফলে ষ্টারমারের ক্ষমতায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, তাদের তিনি মন্ত্রিত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করেন। প্রথম যে চমক দিলেন তা হলো নূতন মন্ত্রিসভার ৫০% ভাগ হলো মহিলা, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে এই প্রথম। উল্লেখ্য, প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েও মার্গারেট থেচার ১৯৭৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি তার মন্ত্রিসভায় কোন মহিলাকে নিয়োগ দেননি। একই দশা ছিল তার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের সময়। তিনিও শীর্ষ কোন পদে কোন মহিলাকে নিয়োগ দেননি। টনি ব্লেয়ার ক্ষমতায় এসে এই চিত্রের কিছুটা পরিবর্তন আনেন। ১৯৯৭ সালে তার (টনি ব্লেয়ার) প্রথম মন্ত্রিসভায় পাঁচ মহিলাকে নিয়োগ দেন। অন্যদিকে, তার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এই ধারাকে উল্টে দেন এবং দেখা যায় কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনামলে এই লিঙ্গব্যবধান ওঠানামা করতে থাকে। স্যার স্টার কিয়েরমারের মন্ত্রিসভায় ৪৬% মহিলা স্থান পান। তবে চমক দেখালেন সদ্য ক্ষমতায় বসা প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহ্যাম। চ্যান্সেলরের গুরুত্বপূর্ণ পদ সহ তার মন্ত্রিসভায় মহিলা সদস্য সংখ্যা ৫০%। এছাড়া এন্ডি বার্নহামের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী থেকে চার সদস্য। এদের মধ্যে রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ, জ্বালানি মন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুলেহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক মন্ত্রী কনিষ্কা নারায়ণ। তাতে মানে দাঁড়ালো, নতুন মন্ত্রিসভার ১৪% শতাংশ সদস্য কৃষ্ণাঙ্গ বা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী থেকে, যা যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১৬% শতাংশের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী থেকে। এই রিপ্রেসেন্টেশন স্যার স্টারমারের আমলের তুলনায় ভালো। তবে ২০২২ সালে ব্রিটেনের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের অর্জিত স্তরের চেয়ে কম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, শুরুতে প্রায় সময় সব সরকার চমক দেখায়। কিন্তু কিছুদিন যেতেই মনে হয় শুরুর যে চমকতাতে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। কথায় আছে গড়ংঃ বীঢ়বপঃধঃরড়হং ভধরষ, সড়ংঃ ড়ভঃবহ যিবহ রঃ রং বীঢ়বপঃবফঅর্থাৎ বেশিরভাগ প্রত্যাশাই ব্যর্থ হয় এবং তা প্রায়শই ঘটে যখন তা প্রত্যাশা করা হয়।এন্ডি বার্নহ্যামের উপর জনগণের অনেক প্রত্যাশা। আশা করি বার্নহ্যামের বেলায় তেমনটি ঘটবে না। দেখা যাকসময় সব বলে দেবে। (২৮০৭২০২৬)

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধশাহ আলম নিপু : সদানন্দে সমর্পিত কর্মচঞ্চল এক মানুষ
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সংগীতশিল্পী পিজিত