এই লেখা যখন ছাপার অক্ষরে বের হবে তখন ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী যে টানটান উত্তেজনা তা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে। আর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে ঘিরে ব্রিটেনে যে চলমান উত্তেজনা, সেটিও যে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছুবে তা অনেকটা নিঃসন্দেহে বলা চলে। বিশ্ব কাপ ফুটবলের পাশাপাশি বৃটেন বেশ কিছুদিন ধরে মেতেছে রাজনীতির খেলায়। এই খেলা য়ুরোপ–বিরোধী ‘রিফর্ম ইউ কে‘ নেতা নাইজেল ফারাজ বনাম দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি, বিরোধী টোরি বা কনজারভেটিভ পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাক্টস। মূলধারার এই রাজনৈতিক দলগুলি এককাট্টা হয়েছে ব্রেক্সিটের প্রথম সারির ক্যাম্পেইনার এবং এন্টি–মাইগ্রেশন নেতা, নাইজেল ফারাজ এবং তার দলকে ব্রিটেনের ক্ষমতা থেকে বাইরে রাখার লক্ষ্যে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে পার্টি সুবিধা করতে না পারলেও মাস কয়েক আগে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। ওই নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে কেবল ক্ষমতাসীন লেবার দলকেই শোচনীয়ভাবে হারায়নি, হারিয়েছে প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাক্টসকেও। নাইজেল ফরাজের এই ল্যান্ডস্লাইড বা ভূমিধস বিজয় ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক ধারার দলগুলিকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বলা চলে দলগুলির নেতাদের ঘুম অনেকটা হারাম করে দিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে নাইজেল ফারাজের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনের কারণ হলো, ক্ষমতাসীন দলের ভেতর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অবৈধ অভিবাসী ঠেকানোয় ব্যর্থতা এবং প্রধান মন্ত্রী স্যার কিয়েরমারের দুর্বল নেতৃত্ব। এ ছাড়া ব্রিটেন সহ গোটা ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে যে এন্টি–অভিবাসী সেন্টিমেন্ট তাকে কাজে লাগিয়ে নাইজেল ফারাজ ব্রিটিশ জনগনের একটি বৃহৎ অংশকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। যার ফলাফল সামপ্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে–র বিশাল সাফল্য। আর এই সাফল্য ধরে রাখতে পারলে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল যে রিফর্ম ইউকে–র দিকে যাবে– সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়না। আর তা হলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, ব্রিটেনে গণতন্ত্রের অকাল মৃত্যু হবে এবং ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের আরো সরে আসা হবে। ব্রেক্সিট সফল হবার পেছনে নাইজেল ফারাজের ভূমিকা ছিল মুখ্য। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, নাইজেল ফারাজের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রয়েছে সু–সম্পর্ক। দু‘জনের চিন্তাধারায় বেশ মিল। অতীতে নাইয়াজেল ফারাজ নিজেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসাবে দেখাতে উৎসাহী ছিলেন। গত ২০২৪ সালে তিনি ট্রাম্প এবং ব্রিটেনের নব নির্বাচিত লেবার পার্টির মধ্যে ‘যোগসূত্র‘ হিসাবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কটা এমনই যে তিনি সরকারের সরাসরি অংশ না হয়েও ফ্লোরিডায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মার–এ–লাগো‘ রিসোর্টে যান। তবে পরবর্তীতে নানা সমালোচনার মুখে তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, মার–এ–লাগোতে গেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে তার দেখা হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় ততদিনে তার সাথে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়। সফরের আগে ফারাজ বলেছিলেন, তিনি সেখানে (মার এ লাগো) নৈশভোজ করবেন।
নাইজেল ফারাজকে ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলির আনা অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো– ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল অপব্যবহারের দায়ে যে দুই পোলিশ নাগরিক দোষী সাব্যস্ত হন তাদের সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। কেবল তাই নয়। তার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টারি কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস, ড্যানিয়েল গ্রিনবার্গের নেতৃত্বে একটি তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ হলো, ক্রিপ্টো–বিলিয়নিয়ার ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে পাওয়া ৫ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান ঘোষণা না দিয়ে তিনি (নাইজেল ফারাজ) হাউস অফ কমন্সের নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। তবে তিনি বারবার দাবি করেন, এই ‘গিফট‘ ঘোষণা দেবার কোনো বাধ্যবাধকতা তার ছিল না, কারণ তিনি ক্ল্যাকটনের এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগেই তা পেয়েছিলেন এবং তা ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়েছিল, যার একটি অংশ ছিল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অর্থায়নের উদ্দেশ্যে। তিনি কোনো অন্যায় করার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, তিনি যা করছেন তা নিয়ম মেনেই করেছেন। এই সমস্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাইজেল ফারাজ যখন বেশ বেকায়দায় তখন তিনি সবাইকে অবাক করে গেল সপ্তাহে তার নির্বাচনী এলাকা ক্ল্যাকটনের এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। সাথে সাথে এও ঘোষণা দেন যে যে তিনি ওই আসনে পুনঃনির্বাচনে দাঁড়াবেন। রাজনৈতিক দলগুলির সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ল্যাকটনের জনগণই আমার কাজের বিচারক হবেন‘।
তার এই ঘোষণাকে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ‘হতাশজনক কৌশল‘ আখ্যা দিয়ে বলেন, তারা এই উপ–নির্বাচনে অংশ নেবেনা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নাইজেল ফারাজের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো তাঁর বিরুদ্ধে যে সমালোচনা তাকে প্রতিহত করা এবং নিজের ব্যক্তিগত জনসমর্থন আরও শক্তিশালী করা। তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, ‘এটি হবে জনগণ বনাম প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার একটি উপনির্বাচন। এটি পুরো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে বুডে়া আঙুল দেখানোর, খোলাখুলিভাবে তাদের বলে দেওয়ার একটি সুযোগ।‘ এই উপ–নির্বাচনে ফারাজ হবেন রিফর্ম ইউকে–র প্রার্থী, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ৮,৪০৫ ভোটের বিশাল ব্যবধানে আসনটি জিতেছিলেন। সমপ্রতি পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে অন্যান্য দলগুলির চাইতে এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ এই মুর্হূর্তে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তবে তার দল এগিয়ে থাকবে। তা জেনে তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘নাটকীয়‘ ঘোষণা দিলেন যে তিনি তার এলাকা থেকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করলেন এবং একই আসনে অনুষ্ঠিতব্য উপ–নির্বাচনে দাঁড়াবেন। এর মধ্যে দিয়ে তিনি দেখাতে চান যে বিরোধী দলগুলি তার সমালোচনায় ব্যস্ত হলেও ভোটাররা এখনো তার ওপর আস্থা হারাননি। এটি তার সরকারি এবং বিরোধী দলগুলির প্রতি ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া। তাতে বিরোধী দল (টোরি পার্টি) প্রধান, আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত কেমি ব্যাডেনক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘টোরি দল থেকে কেউ এই আসনের উপ–নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেননা।‘ অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস নেতা, এড ডেভি বলেন, ‘যদি এই উপনির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হয়, তবে আমরা সব দলকে সরে দাঁড়াতে এবং ফারাজের এই ‘ আত্মম্ভরিতামূলক প্রকল্পে‘ ইন্ধন না দিতে অনুরোধ জানাচ্ছি।‘ অন্যদিকে লেবার পার্টির এক মুখপাত্র বলেন: ‘নাইজেল ফারাজ একটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন এবং তিনি মরিয়া হয়ে বিষয়টি অন্যদিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছেন। এটি করুণ এবং লেবার পার্টি এতে প্রশ্রয় দেবে না।‘ যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে নাইজেল ফারাজের যে–কৌশল নিজেকে জনপ্রিয় দেখানোর প্রচেষ্টা তা যে সফল হবেনা তা বলা বাহুল্য। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। তাঁর এক মুখপাত্র বলেন, ‘ফারাজের অর্থ দাতাদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য এটি তার একটি কৌশল।‘
নাইজেল ফারাজের দশা অনেকটা হল্যান্ডের কট্টর ডান নেতা, খিয়ের্ট বিল্ডার্সের মত। এন্টি ইউরোপ ও এন্টি–অভিবাসী মতবাদে বিশ্বাসী নেতা বিল্ডার্স ডাচ জনগণের মাঝে বেশ জনপ্রিয় এবং পাঁচ বছর আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তার দল শীর্ষে অবস্থান করলেও তাকে ঠেকাতে সব রাজনৈতিক দলগুলি এককাট্টা হয়ে ঘোষণা দিয়েছিল তাদের কেউ বিল্ডার্সের সাথে ‘কোয়ালিশন সরকার‘ গঠন করবে না। ফলে সেবারের নির্বাচনে তার দল (ফ্রিডম পার্টি) বিজয়ী হলেও অন্যান্য দলগুলির অসহযোগিতার কারণে তিনি প্রধান মন্ত্রী হতে পারেননি। তবে এককভাবে সরকার গঠন করার মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার দল পায়নি। তাকে অন্যান্য দলের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হতো। ফলে প্রধান মন্ত্রী হবার তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেস্তে গিয়েছিল। দলগুলির যুক্তি ছিল বিল্ডার্স দেশের প্রধান মন্ত্রী হলে হল্যান্ডের দীর্ঘদিনের সহনশীল জাতি হিসাবে যে ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে তা ক্ষুণ্ন হবে এবং মুক্ত গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে। রিফর্ম ইউকে–র নেতা নাইজেল ফারাজের ভাগ্যে কি সেই জাতীয় ফলাফল অপেক্ষা করছে কিনা সেটা এখন দেখার বিষয়। আর তা দেখার জন্যে আমাদের আরো বেশ কিছুদিন, কয়েকটা বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। (১৪–৭–২০২৬)
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট












