সড়ক নয়, যেন ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও কন্টেনার মুভারের টার্মিনাল

পোর্ট কানেক্টিং রোড অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট, দুর্ঘটনা, বন্দরের পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত অবৈধ দখলমুক্ত রাখা ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের দাবি

হাসান আকবর | বুধবার , ৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ

দেশের লাইফ লাইনখ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য আনানেওয়ার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল চার লেনের পোর্ট কানেক্টিং রোড। কিন্তু যথাযথ নজরদারির অভাবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি কার্যত অবৈধ ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং কন্টেনার মুভারের টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। বন্দরমুখী ও বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্যবাহী যানবাহনের পাশাপাশি নগরীর বাস, মিনিবাস, টেক্সি, প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ঠেলে চলাচল করতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের কন্টেনার ইয়ার্ড, নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি), চট্টগ্রাম কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং বিভিন্ন বেসরকারি কন্টেনার ডিপোর সঙ্গে সংযোগের অন্যতম প্রধান সড়ক হচ্ছে পোর্ট কানেক্টিং রোড। প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার কন্টেনার ও বিপুল পরিমাণ সাধারণ পণ্যবাহী গাড়ি বন্দর থেকে ডিপোগুলোসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আসাযাওয়া করে। পোর্ট কানেক্টিং রোডে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে।

বন্দরকেন্দ্রিক গাড়ির গতিশীল চলাচল নিশ্চিত এবং পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নব্বইয়ের দশকে নির্মাণ করা হয় পোর্ট কানেক্টিং রোড। চট্টগ্রাম বন্দরের ভারী পণ্যবাহী যানবাহন ও ট্রাক শহরের ভেতর প্রবেশ না করিয়ে সরাসরি ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে যুক্ত করার জন্য অলংকার মোড় থেকে বন্দরের নিমতলা পর্যন্ত ৫ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মুল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন বের হওয়া হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং কন্টেনার মুভার যাতে নগরীর মূল ট্রাফিক জ্যাম এড়িয়ে দ্রুত ঢাকা বা দেশের অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারে, আবার একইভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা পণ্যবাহী গাড়ি যাতে শহরে প্রবেশ না করে ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সরাসরি বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এটিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইফলাইন’ সড়ক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। বন্দরকে মহাসড়কের সাথে সরাসরি কানেক্ট বা সংযুক্ত করার কারণেই সড়কটির নাম রাখা হয় পোর্ট কানেক্টিং রোড বা পিসি রোড।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে আমদানিরপ্তানি পণ্য দ্রুত পরিবহন এবং নগরীর যান চলাচলে গতি আনতে নির্মিত চার লেনের এই সড়কের দুই পাশে দিনের পর দিন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মুভার। কোথাও এক সারি, আবার কোথাও দুই সারি করে ভারী যানবাহন পার্কিং করে রাখায় চার লেনের সড়ক অনেক স্থানে কার্যত এক বা দুই লেনে নেমে এসেছে। এই সড়কে সামান্য প্রতিবন্ধকতাও পুরো বন্দরের লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন চালক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নির্ধারিত ট্রাক টার্মিনালের অভাব, বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থার সংকট এবং প্রশাসনের নজরদারির দুর্বলতার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে সড়কটিকে পার্কিং ইয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দিনের বেলায় পণ্য খালাস বা লোডিংয়ের অপেক্ষায় থাকা ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মুভার ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। ফলে যানবাহন চলাচলে স্থবিরতা নেমে আসে।

সূত্র জানায়, পোর্ট কানেক্টিং রোড দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ভারী যানবাহন বন্দরে প্রবেশ ও বন্দর থেকে বের হয়। একই সঙ্গে এই সড়ক দিয়ে নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর, বন্দর, পতেঙ্গা, ইপিজেড ও কর্ণফুলী এলাকার লাখো মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন। কিন্তু অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে স্বাভাবিক সময়ে কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে অনেক সময় ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স এবং সাধারণ যাত্রীরা প্রতিদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, যানজটের কারণে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে কন্টেনার বন্দরে পৌঁছাতে না পারায় জাহাজের লোডিংআনলোডিং কার্যক্রমও অনেক সময় বিঘ্নিত হয়। এতে আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, সময় অপচয় এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারমূল্যের ওপরও পড়ে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের পাশাপাশি অনেক স্থানে ট্রাক মেরামত, টায়ার পরিবর্তন এবং মালামাল ওঠানামার কাজও চলে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ভারী যানবাহনের কারণে পথচারীদের নিরাপদে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং এলোমেলো পার্কিংয়ের কারণে প্রায় ছোটবড় দুর্ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ সচল রাখতে পোর্ট কানেক্টিং রোডকে সব ধরনের অবৈধ দখল ও পার্কিংমুক্ত রাখা জরুরি। এজন্য বিকল্প ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, নির্ধারিত পার্কিং জোন চালু, সড়কে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বন্দর, ট্রাফিক পুলিশ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতিদিনের যানজট ও বিশৃঙ্খলা নগরবাসীর দুর্ভোগের পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজবি, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায় শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ, আহত ৯৭
পরবর্তী নিবন্ধদণ্ডিত আসামির বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার না করার আহ্বান তথ্য মন্ত্রণালয়ের