‘জন্মিলে মরিতে হইবে’–এই মহাসত্যকে ধারণ করে আবহমানকাল থেকেই মানবজাতি নিজের জিন্দেগী পরিচালনা করে আসছে। সবাইকে চলে যেতে হবে সেই মহান স্রষ্টার কাছে–যিনি দেখা–অদেখা সবকিছুর খবর রাখেন এবং এই মহাবিশ্বের একমাত্র নিয়ন্ত্রক। ‘প্রত্যেক প্রাণী মরণের স্বাদ ভোগ করবে, তোমাদের পাওনা কেয়ামতের দিন পুরোপুরি আদায় করে দেওয়া হবে, যাকে আগুন থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলতা পাবে। এই পার্থিব জীবন ছলনার ভোগসামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়’–সূরা ইমরান–১৮৫। আল্লাহতায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘প্রতিটি জীবকে মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো উভয় অবস্থার মধ্যে ফেলেই পরীক্ষা করি, অতঃপর তোমাদের আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে’–সূরা আম্বিয়া–৩৫। রাউজানের এক বিরল প্রতিভার অধিকারী, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, সুমিষ্টভাষী, সদালাপী, বহুগুণে গুণান্বিত সফল সরকারী চাকরিজীবী, পদ্মা অয়েল কোম্পানীর সাবেক প্রধান হিসাবরক্ষক সায়ফুদ্দিন আহমদ গত ১৮ জুলাই এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে মহান রাব্বুল আ’লামিনের মেহমান হয়েছেন। তিনি আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না, এই পৃথিবীর কোলাহলে আর কখনোই ফিরবেন না একজন সায়ফুদ্দিন আহমদ। যিনি ছিলেন পুরোদস্তুর এক পরিপূর্ণ মানুষ–যার পরিচয় বহন করে তাঁর অবিশ্বাস্য সততা ও স্বচ্ছতায়। নির্লোভ এই মানুষটি সহজেই অপরিচিত মানুষকে আপন করে নিতেন। যার পথ চলায় ছিল এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়, জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের হাল ধরেছিলেন এই দুঃখী মানুষটি। অপরাপর ৪ ভাইকে পরম স্নেহে আগলে রাখতেন পিতৃসুলভ মমতায়। স্নেহের পরশে কঠিন সংগ্রামের এক অবরুদ্ধ দাবানল পেরিয়ে সম্মুখপানে যাত্রা, এই যাত্রা যেন কুসুমাস্তীর্ণ নয়–এটি কন্টকাকীর্ণ পথ। অতীব কষ্ঠের মহাকাব্য এই বিরল ব্যক্তির সামনে দাঁড়িয়ে। পুরো পরিবারের বোঝা আরোহণের যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি–তা যেন কখনো পরাভব মানে না এই দুর্জয় মানুষের প্রতিটি কদম। দুঃখ আর বেদনার বিশাল অট্টালিকার মোড়কেই যেন যাপিত হয় এই মানুষটির তাবৎ জীবন। স্নেহ আর মমতার অনবদ্য পরশে ভাই বোনদের আগলে রাখতেন প্রতিটি ক্ষণ। এলাকায় একজন নির্মোহ ব্যক্তির পরিচয় বহন করে চলেছিল পুরোটা জীবন। চিকদাইর এলাকার প্রতিটি মানুষের চোখে যেন আটলান্টিকের অকৃত্রিম ছোঁয়া। চোখের রেটিনা থেকে ধাবিত হয় মহাকালের অশ্রু। আজ বেদনার হাইওয়েতে অসংখ্য মানুষের বুকফাটা আর্তচিৎকার। একজন সায়ফুদ্দিন আহমদ আর এই তল্লাটে আসবেন না । কিন্তু তাঁর আদর্শ রয়ে যাবে চিরকাল, প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে রোপিত হবে তাঁর আদর্শের বীজ। ‘ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর, অবিনশ্বর শুধু তোমার রবের মুখমন্ডল–যিনি মহিমান্বিত মহানুভব’ সূরা–আর রহমান– ২৬–২৭। অতএব এক আল্লাহই চিরস্থায়ী জীবনের অধিকারী। তিনি কখনো ধ্বংস হবেন না। দানব ও মানব প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকরী। অনুরুপভাবে মালাইকা ও আরশ বহনকারীরাও মরণশীল। শুধুমাত্র অদ্বিতীয় আল্লাহই চিরকাল বাকি থাকবেন। তাঁর কোন লয় ও ক্ষয় নেই। প্রথমেই তিনি এবং শেষেও তিনিই থাকবেন। হযরত আদম (আঃ) এর পৃষ্ঠ হতে যত সন্তান হওয়ার ছিল হয়ে যাবে, দীর্ঘমেয়াদী সময় শেষ হয়ে যাবে, অতপর সকলেই মৃত্যুর ঘাটে অবতরণ করবে এবং সমস্ত সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে। যেসময় আল্লাহতায়ালার হুকুমে কেয়ামত সংঘটিত হবে–সেদিন তিনি সকলকেই তাদের ছোট বড় সকল কাজের প্রতিদান দেবেন। কারো উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করা হবে না। সায়ফুদ্দিন আহমদ স্মরণে ২৩ জুলাই নগরীর একটি মিলনায়তনে দোয়া মাহফিল হয়েছিল। বরেণ্য আলেমে দ্বীন, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ধর্মভীরু, পরোপকারী, সদাহাস্য সায়ফুদ্দিন আহমদ আর এই তল্লাটে আসবেন না–সেই মহান রবের কাছে তিনি হাজির হয়েছেন। তাঁর আমলনামা পরম দয়ালু রব যেন ডান হাতে প্রদান করেন–সেই হৃদয়নিঃসৃত দোয়াটি শোকসভায় উপস্থিত সকলেই আবেগভরা কণ্ঠে করেছেন সাবলীলভাবে। তাঁর এই মৃত্যুতে রাউজান ক্লাব পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। কালের গর্ভে এভাবেই হারিয়ে যায় হাজারো মানুষ–কিন্তু ভালো মানুষদের আদর্শ, তাঁদের পদচিহ্ন আমাদেরকে দেয় সৎ পথের দিশা। তেমনি একজন সায়ফুদ্দিন আহমদ আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন সত্যিকার আদর্শিক ও মানবিক মানুষের গুণাবলী কেমন হতে পারে। বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার প্রফেসর ড. বি এম মফিজুর আল–আযহারির কণ্ঠে আবেগঘন মোনাজাত পুরো পরিবেশটায় পিনপতন নীরবতা এনে দেয়। তাঁর মোনাজাতের ভাষা ছিল অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী। সে পথের প্রতীক্ষায় আছে–যে পথে গেছেন আল্লাহর রাসূল ও তাঁর প্রিয় সাহাবীগণ, তাবে–তাবেঈগণ, সালফে–সালেফিনগণ। হয়তো আগামী সেমিনারে কেউ একজন থাকবেন না–এ বিষয়টি উপস্থিত সবার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়। ক্ষণিকের মেহমান হয়ে আসা এই পার্থিব জীবন ছলনার মালসামানা ছাড়া আর কিছুই নয়। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটি আসলেই একজন সফল মানুষ, তাঁর প্রতিটি পদচারণায় উত্তম আমলের চিহ্ন রেখে গেছেন, যিনি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। সত্যিকার অর্থে প্রত্যেক জীব মরণশীল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ হে মোহাম্মদ! তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষকে দুনিয়ায় অনন্ত জীবন দান করিনি’। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মোহাম্মদ! তুমি যেদিন মৃত্যুবরণ কর তাহলে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে? অর্থাৎ তারা কি আশা করছে যে, তোমার মৃত্যুর পর তারা দুনিয়ায় চিরদিন বেঁচে থাকবে? না এটা হতে পারে না, বরং প্রত্যেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে’। এই জন্যই আল্লাহতায়ালা বলেন,‘ জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে–আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো উভয় অবস্থার মধ্যেই ফেলে বিশেষভাবে পরীক্ষা করি এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ সূরা আম্বিয়া– ৩৫। এই আয়াত দ্বারা আল্লাহতায়ালা বুঝাতে চেেেয়ছেন– আল্লাহতায়ালা ভালো ও মন্দ দ্বারা, সুখ ও দুঃখ দ্বারা, মিষ্ঠ ও তিক্ত দ্বারা এবং প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতা দ্বারা পরীক্ষা করেন– যাতে কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল ও হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি প্রকাশ হয়ে পড়ে। ঐশ্বর্য ও দারিদ্রতা, কঠোরতা ও কোমলতা, হালাল ও হারাম, হেদায়াত ও গোমরাহী, আনুগত্য ও অবাধ্যতা–এসবই পরীক্ষামূলক। এর দ্বারা ভালো ও মন্দ উভয় প্রকাশ পায়। এরপরে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের সবারই প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই–ঐ সময় কে কেমন আমল করেছিল তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। পাপীরা শাস্তি ও উত্তম আলমকারীরা পুরস্কার লাভ করবে। সায়ফুদ্দিন আহমদ এর বড় ছেলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আর ছোট ছেলে পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে কর্মরত। মৃত্যুর পর মানুষ ৩টি জিনিস রেখে যায় ১) নেক সন্তান ২) দান খয়রাত ও ৩)উপকারী জ্ঞান। উনার সন্তানগুলো যেন নেক সন্তানদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হন–আমিন। কালের আবর্তে হারিয়ে যায় বহু সায়ফুদ্দিন কিন্তু আদর্শ সায়ফুদ্দিনের সংখ্যা অতীব নগণ্য। তাঁর আদর্শকে লাইমলাইটে এনে পথচলা অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে। এই কর্মবীর মানুষটিকে মহান রব যেন জান্নাতুল ফেরদৌস দাখিল করেন, আমিন।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব; অধ্যাপক (চ. দা)-ইএনটি– অবঃ,
রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ












