
সবাইতো স্বপ্ন দেখে, সবাইতো ছবি আঁকে
কখনও না কখনও
সবাইতো গান গায়, সবাইতো মালা গাঁথে
কখনও না কখনও
আমিও এঁকেছিলাম তোমার ছবিটি সেদিন,
অনেক স্বপ্ন নিয়ে।
( এ স্বপ্ন ছিলো না। সালমা চৌধুরী লিখিত কবিতা)
আমরা মানবকুল, কখনও কখনও এমন স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি। মনের ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে সংকল্পবদ্ধ হই। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাই জীবনের অভিমুখে। সালমা চৌধুরী লিখিত ‘পারাবত পাখনায়’ কাব্যগ্রন্থে উপরোক্ত কবিতাটি লিখেছেন।
সত্তর দশকে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রিয় ও পরিচিত মুখ হলেন সালমা চৌধুরী। আমাদের প্রিয় খালামনি। আহা…. আমাদের প্রিয় রহমতগঞ্জ। খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার রোড। আন্দরকিল্লা ও মোমিন রোডের মাঝখানে একটি রাস্তা নিচু হয়ে নেমে জে.এম. সেন হলের সামনে দিয়ে চলে গেছে গুডস হিলের পাদদেশ হয়ে গনি বেকারী, মিসকিন শাহ মাজার, চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ হয়ে চকবাজার। রহমতগঞ্জ মসজিদের সামনে গলির তিন নম্বর বাসাটি ছিল সালমা খালামনির বাসা। আর রাস্তার পাশে গলির মুখে ছিল আমাদের। আমাদের শৈশব – কৈশোর – তারুণ্য – যৌবনকাল কেটেছে এই রহমতগঞ্জে। খালামনির বাসার পরের বাসাটি ছিল দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ড. এনামুল হকের। নাম: সেঁজুতি। বাসার সামনেই পুকুর। এই পুকুরেই আমাদের যত লাফালাফি। সাঁতার কাটা। যা হোক, আমার বড় বাবা অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র সিংহ ছিলেন শিক্ষাবিদ। ফলে ড. এনামুল হকের মতো আরেক বরেণ্য শিক্ষাবিদ যখন প্রতিবেশী, সুতরাং দুই পরিবারের সখ্যতা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। আর এমন আবহে আমাদের বেড়ে ওঠা। শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় চট্টগ্রাম অনেক সমৃদ্ধ। তারই ধারাবাহিকতায় সালমা চৌধুরী নিজেকে যেমন যুক্ত রাখতে পেরেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মদেরও উৎসাহ দিয়ে গেছেন। আর এমনিভাবেই আমার জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে সালমা খালামনি। ১৯৭৬/৭৭ সাল। সেন্ট মেরী‘স স্কুলে পড়ছি। রবিবার ছুটির দিন। এক সকালে খালামনি আমায় নিয়ে গেলেন বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রে। একটি রুমে বসালেন। আমার মতো পিচ্চি – পাচ্চা আরও ছিল। একটি চেয়ারে খালামনি বসা। আমাদের এক এক করে ডাকলেন। মাইকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বলতে শুরু করলাম: আমার নাম শান্তনু। আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করবো। লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বীরপুরুষ…. ‘মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে…..’
ব্যস, এই হলো খালামনির হাতধরে আমার সংস্কৃতি চর্চায় পদার্পণ। আমি তো শুনলাম না। বাসায় রেডিওতে বড়বাবা (অধ্যক্ষ যোগেশ চন্দ্র সিংহ), বড়মা, দিদা,বাবা, মা – সবাই শুনেছে।
রহমতগঞ্জে নবীনমেলা আর দেওয়ানজী পুকুর পাড়ে অগ্রণী সংঘ। আমাদের আর কে পায়। কখনো নবীনমেলা আবার কখনো অগ্রণী সংঘ। দুইটাতেই যেতাম। সালমা খালামনি নবীনমেলার উপদেষ্টা ছিলেন। যার কারণে, আমাকে নবীনমেলার যেতে বলতেন। টেবিল টেনিস খেলার পাশাপাশি সাহিত্য আসরে নিয়মিত অংশ নিতে হতো। কারণ, খালামনির নির্দেশ। যাক, লেখালিখির শুরুটা নবীনমেলা সাহিত্য আসরের মাধ্যমে হলো। পরে দৈনিক আজাদী পত্রিকায় আগামীদের আসরে লেখা শুরু।
১৯৭৮ সালে মৌসুমী প্রতিযোগিতা হয় সারাদেশে। চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত হয়। সালমা খালামনি ও মাহবুব হাসানের নেতৃত্বে ‘লোকালয় নাট্য সমপ্রদায়’ নামে একটি নাটকের দল ছিল। ঐ সময়ে চট্টগ্রামে এই দলটি মঞ্চ নাটকে বেশ সুনাম অর্জন করে। ‘যদি আমি কিন্তু আমি’ এই দলের জনপ্রিয় নাটক। যা হোক, ‘জুনিয়র লোকালয়’ –এর হয়ে একটি নাটক মৌসুমী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। আমরা অভিনয় করবো। বিদেশী গল্প অবলম্বনে নাটক ‘বন্ধু রাজপুত্র’। সোমা আপা, পিংকী ( মাহবুব হাসান আঙ্কেলের ছেলে), আমি, শাহানা খালার মেয়ে মিতুসহ আরও কয়েকজন ছিল। আমার চরিত্র ছিল চড়ুই পাখির। পাখির আদলে পোশাক, ডানা তৈরি হলো। প্রতিদিন রিহার্সাল হতো খালামনির বাসায়। সে কী উত্তেজনা। যা হোক, মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে মঞ্চস্থ হলো। আমরা তৃতীয় স্থান লাভ করি। যদিও প্রথম হবো আশা ছিল। যাক, পরবর্তীতে এই নাটক চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারস ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়। নাটকের প্রতি দুর্বলতা বা আগ্রহ ঐ সময় থেকেই। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের বিখ্যাত অরিন্দম নাট্য সমপ্রদায়ে (সদরুল পাশা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত) কাজ করি। এটাও আমার জীবনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক।
আমাদের পারিবারিক বন্ধন এতটাই মজবুত ও দৃঢ় ছিলো যে, তা আজ অনুকরণীয়। এখন ভাবতে কষ্ট হয়, কেমন দিন ফেলে এসেছি।
এবার একটি মজার ঘটনা বলি। ১৯৮০ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এমন একটি সংবাদ খুব চাউর। খালামনি পরিকল্পনা করলেন, আমরা তিন পরিবার (সালমা খালামনি, উনার ছোট বোন শাহানা খালা, আমাদের পরিবার) একসাথে 31st December পালন করা হবে। যার যার বাসা থেকে খাবার রান্না নিয়ে আসা হবে। আমরাও দারুণ উত্তেজিত। কারণ, এমন দিন উদযাপন করা আমার জন্য প্রথম। সোমা আপা, বাবু ভাই, মিতুসহ আমরা আনন্দের মধ্যে আছি। রাত বারোটা এক মিনিটে সবাই চিৎকার করে উদযাপন করেছিলাম। এমন করেই সালমা খালামনি আমাদের নিয়ে মেতে থাকতেন।
১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে ‘অনুপ্রাস’ নামে একটি কবি সংগঠন গঠিত হয়। ঢাকা কেন্দ্রিক। যার সভাপতি ছিলেন খোশনূর আলমগীর। চট্টগ্রামে এই সংগঠনের সভাপতি সালমা খালামনি এবং আমি হলাম সাধারণ সম্পাদক। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ছবিসহ সংবাদ। সংগঠনে নেতৃত্বের কাজ করার শুরুটা খালামনির হাত ধরেই। এভাবেই আমার এগিয়ে চলা। ঐ সময়ে সালমা খালামনির উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, কড়া শাসন না পেলে হয়তো অন্যরকম হতে পারতো। আসলে ঐ সময়ের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, শ্রদ্ধার বিষয়টি ছিল অন্যরকম। সালমা খালামনি অধ্যাপনা করেছেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, নাটক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, গার্লস গাইডসহ নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। এখন ২০২৬ সালে এসে উপলব্ধি করি, ঐ সময়টা আসলেই আনন্দের ছিল। সৃষ্টিশীলতার ছিল।
জানি সময়কে ধরে রাখা যায় না যে মুহূর্তে হারালো / তাকেও আর ফিরে পাওয়া যায় না। তবু আমি নোয়াব না মাথা মানবো না হার / বহমান সময় তোমার কাছে। চাইবো না ভিক্ষে কাঙালের কত / তোমার অপার ঐশ্বর্য থেকে ভুলেও একটি কণা তার। ( পরাজিত সে।। সালমা চৌধুরী লিখিত কবিতা)।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক।













