রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) দেশের পণ্য রফতানি ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কমেছে। এ খাতের সবচেয়ে বড় পণ্য তৈরি পোশাকের রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, রফতানির শীর্ষ পাঁচের অন্যতম কৃষিজ পণ্যের কমেছে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। রফতানির পাশাপাশি আমদানিতেও মন্দা ভাব বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে দশমিক ১৯ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, শিল্প কাঁচামালের ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, আমদানি ও রফতানি উভয় খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে, যা দেশের অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইপিবির তথ্য অনুযায়ী ১০ মাসে মোট পণ্য রফতানি কমে যাওয়াটা শুধু একটি সংখ্যাগত পতন নয়; এটি দেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের প্রতিফলন। বৈশ্বিক মন্দা ভাব, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে চাহিদা হ্রাস প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাককে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বাজারে অস্থিরতা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। ফলে দেশের রফতানিমুখী শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, রপ্তানি বাণিজ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম উৎস। যেকোনো বিকাশমান দেশের জন্যই বৈদেশিক মুদ্রায় আয় সক্ষমতা বৃদ্ধি সমৃদ্ধি বাড়ায়। ইদানীং বৈশ্বিক নানা বাধা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
রপ্তানির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের আরেক অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। এ দুই উৎস দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যত বাড়ে, ততই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ফলে দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। তা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যত শক্তিশালী হয়, ততই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা উন্নত হয়।
ফলে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। কিন্তু তিন মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রভাব কমবে ও দেশের রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। এতে ডলার–সংকট দেখা দেবে। আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে।
আমদানি হ্রাস প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমদানি নির্ভর করে রফতানির ওপর। রফতানি প্রক্ষেপণ ও ক্রয়াদেশ যদি কম থাকে তাহলে আমদানি কম থাকারই কথা। আবার কাঁচামালের দাম ওঠানামার বিষয়টি এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে তৈরি পোশাকের কাঁচামালের দাম মোটামুটি স্ট্যাবল ছিল। সব মিলিয়েই রফতানি কমেছে, আবার আমদানিও কমেছে।’
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নীতিনির্ধারকরা আমদানি–রফতানি পরিস্থিতির জন্য ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে দুটি বড় যুদ্ধ চলমান। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল যে প্রণালি দিয়ে পার হয়, সেই পথ এখন এক ধরনের স্থবিরতার মুখে, যার সম্মিলিত প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর পড়ছে।
আমদানি–রফতানি পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে তাতে। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে এখন দুটি যুদ্ধ চলমান; বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। গত দুই মাস এমন এক অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে, যার সঙ্গে নৌপথের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল যে প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেটি এখন বন্ধ। এর একটি বড় ধরনের পুঞ্জীভূত প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ছে। এ বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সামপ্রতিক তথ্য দিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক হবে না। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর যখন স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, তখন পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে।’ অর্থনীতির স্বার্থে এবিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।









