চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কন্টেনার এক ইয়ার্ড থেকে অন্য ইয়ার্ডে স্থানান্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। এই দরপত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ, প্রতিযোগিতা সীমিত করার মতো শর্ত এবং প্রি–বিড সভার পরও মূল বিতর্কিত শর্ত বহাল রাখার বিষয়ে সমালোচনা চলছিল। অবশেষ গতকাল রোববার দরপত্রটি বাতিল করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালকের (ট্রাফিক) দপ্তর থেকে জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আহ্বানকৃত দরপত্র অনিবার্য কারণবশত যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো।
১৪ জুন আহ্বান করা পাঁচ বছর মেয়াদি ওই দরপত্রে এমন কিছু যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়েছিল, যা বাস্তবে সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হতো না বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট অন্য অপারেটররা।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঠিকাদারের নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর–ট্রেইলার ব্যবহার এবং নিজস্ব সরঞ্জাম দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন্দরের জিসিবি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অন্য কোনো অপারেটরকে নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার দিয়ে একই ধরনের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহার করে কাজের অভিজ্ঞতার শর্তটি কার্যত নতুন প্রতিযোগীদের প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেয়।
দরপত্র নিয়ে আপত্তি ওঠার পর ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে সদস্যের (অর্থ) সভাপতিত্বে প্রি–বিড সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দরপত্রের কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হয়। ১০ বছরের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত পরিবর্তন করে গত ২৫ বছরের মধ্যে যেকোনো পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়। সরঞ্জামের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা হয় এবং এক কোটি টাকার জামানত কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়।
তবে অভিযোগের মূল জায়গা নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর–ট্রেইলার ব্যবহার করে কাজের অভিজ্ঞতার শর্তটি বহাল রাখা হয়। ফলে অন্যান্য অপারেটররা টেন্ডার নিয়ে ঘোরতর আপত্তি তোলেন। তারা প্রশ্ন তোলেন, তাদেরকে তো অতীতে বন্দর এলাকায় নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ব্যবহার করে কাজ করার সুযোগই দেওয়া হয়নি, তারা কীভাবে ওই অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করবে?
চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবিতে খালি কন্টেনার স্থানান্তরের কাজ নতুন নয়। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালেও জিসিবি এলাকায় ইয়ার্ড থেকে ইয়ার্ডে খালি কন্টেনার স্থানান্তরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সে সময়ের দরপত্রে ঠিকাদারের নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর–ট্রেইলার ব্যবহার করে সাত বছরের জন্য কাজ করার কথা উল্লেখ ছিল।
জিসিবি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে পুরনো টার্মিনালগুলোর একটি। এখানে ছয়টি কন্টেনার জেটি পরিচালিত হয়। ২০০৭ সাল থেকে এসব জেটিতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে আসছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিসিবির ছয়টি জেটিতে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অপারেটরদের কার্যক্রম রয়েছে। খালি কন্টেনার হ্যান্ডলিং নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা অবশ্য কেবল একটি দরপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছর ধরে খালি কন্টেনারের অতিরিক্ত চাপ বন্দরের ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বন্দরের নির্ধারিত খালি কন্টেনার ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৫ হাজার ৫০০ টিইইউএস হলেও সেখানে ৭ হাজারের বেশি খালি কন্টেনার থাকে। এতে আমদানি পণ্য খালাস, নতুন কন্টেনার রাখার জায়গা এবং সামগ্রিক ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার কাজে গতিশীলতা কমে যায়।
খালি কন্টেনার দ্রুত সরানো না গেলে শুধু ইয়ার্ডের জায়গা দখল হয় না, একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্যবাহী কন্টেনারের জন্য কার্যকর স্ট্যাকিং স্পেসও কমে যায়। ফলে জাহাজ থেকে কন্টেনার নামানো, ইয়ার্ডে রাখা, আমদানিকারকের কাছে ডেলিভারি এবং পরবর্তী রপ্তানি কন্টেনার হ্যান্ডলিংসহ বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ পড়ে। এ কারণে খালি কন্টেনার দ্রুত স্থানান্তরের কাজটি বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালি কন্টেনার স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলে বন্দরের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেবার মানও বাড়তে পারে। বিপরীতে যোগ্যতার শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে হাতে গোনা এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য হয়, তাহলে প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
দরপত্র বাতিলের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিও। এর আগে একই কাজের দরপত্র মামলা বা অন্য জটিলতায় আটকে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আগের দরপত্র–সংক্রান্ত বিরোধের পর এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ডিপিএম পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে আসছিল। এই কাজের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয় বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র বলেছে, নতুন দরপত্র বাতিলের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদি নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা কোনো কারণে প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়, তাহলে একই কাজের জন্য আবারও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ যে সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা–সমালোচনা চলে আসছে। সাইফ পাওয়ারটেক বর্তমানে চট্টগ্রাম কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি অতীতে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালও পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস জিসিবির অপারেটরদের মধ্যে রয়েছে।
২০২৬ সালে সাইফ পাওয়ারটেক, কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল কার্যক্রমে একই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের নোটিশে দরপত্র বাতিলের কারণ হিসেবে শুধু ‘অনিবার্য কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে চবক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা তদন্ত করেনি। দরপত্রটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর প্রকৃত কারণ কিংবা টেন্ডারে প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা কী ছিল সে ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি।
এদিকে বন্দর পরিচালনাকারী অপারেটরদের শীর্ষ সংগঠন বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেছেন, নতুন করে এমন শর্তে দরপত্র আহ্বান করা উচিত যাতে সব যোগ্য ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। তার মতে, দরপত্র স্বচ্ছ, সহজ ও উন্মুক্ত না হলে মামলা বা ডিপিএম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বছরের পর বছর একই ধরনের কাজ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বন্দরের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন বন্দর কর্তৃপক্ষের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিতর্কিত দরপত্র বাতিলের পর কত দ্রুত নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং নতুন দরপত্রে যোগ্যতার শর্ত কীভাবে নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে ‘নিজস্ব এম্পটি হ্যান্ডলার দিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা’ ধরনের শর্ত রাখা হলে অতীতে ওই সুবিধা না পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রতিযোগিতায় আসবে তা পরিষ্কার করা।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, নতুন দরপত্রে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, যোগ্যতার শর্ত বাস্তবসম্মত ও বৈষম্যহীন হওয়া, দ্বিতীয়ত, বন্দর এলাকায় ইতিপূর্বে কাজের সুযোগ না পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ রাখা এবং তৃতীয়ত, দরপত্র প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী মামলা, শর্ত বা প্রশাসনিক জটিলতার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দীর্ঘদিন ধরে কাজটি নিজের কব্জায় রাখতে না পারে। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে দিন শেষে বন্দর তথা দেশই লাভবান হবে।










