সংকটে বেহাল বাকলিয়া সরকারি কলেজ

কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট থেকে সরকারি কলেজে রূপান্তর ২০১৬ সালে ।। শিক্ষার্থী বেড়ে তিন গুণ ।। কার্যাদেশের দুই বছরেও শুরু হয়নি নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ১৬ জুলাই, ২০২২ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

কলেজটির একাদশ শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে ১ হাজার ৪২৮ জন। আর দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে ১ হাজার ৩০৯ জন। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক, তিন বিভাগেই পাঠদান চলে কলেজটিতে। সবমিলিয়ে (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে) কলেজটির মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি (২ হাজার ৭৩৭ জন)। কিন্তু এই আড়াই হাজারের বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদানে রয়েছে মাত্র ৮টি শ্রেণিকক্ষ! পুরনো চারতলা একটি মাত্র ভবনের এই ৮টি শ্রেণিকক্ষই যেন সম্বল কলেজ কর্তৃপক্ষের। অথচ চারতলা ভবনটি সর্বোচ্চ এক হাজার শিক্ষার্থীর শ্রেণি কার্যক্রমের উপযোগী বলছেন সংশ্লিষ্টরা। হিসেবে এক হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদানের উপযোগী ভবনটিতে প্রায় তিনগুণ শিক্ষার্থীর শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। বাকলিয়া সরকারি কলেজের চিত্র এটি। নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার সন্নিকটে এর অবস্থান। চট্টগ্রাম গভমেন্ট কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট থেকে সরকারি কলেজে রূপান্তরের পর (অন্তত ৫ বছর ধরে) এভাবেই চলছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম। অবকাঠামো ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ও কর্মচারী সংকটে যেন দূরাবস্থা কলেজটির। সবমিলিয়ে সমস্যা-সংকটে যেন বেহাল সরকারি এ কলেজ। ২০১৬ সালে এটি সরকারি কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। আর ওই বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের তিন বিভাগে (বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক) ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বর্তমানে চারতলা যে ভবনটিতে শ্রেণি কার্যক্রম চলছে, সেটি গভমেন্ট কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট থাকাকালীন পুরনো ভবন। গভমেন্ট কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে কেবল ব্যবসায় শাখার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ এক হাজার। কিন্তু ২০১৬ সালে সরকারি কলেজে রূপান্তরের পর তিন বিভাগেই (বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকে) শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রথম বছর (২০১৬ সালে) কেবল একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করানোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। তবে পরের বছর থেকে দুই বর্ষে (একাদশ ও দ্বাদশ) মিলিয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কলেজটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রথম বছরের তুলনায় এখন প্রায় তিন গুণ। বছর বছর শিক্ষার্থী বাড়লেও অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা বাড়েনি কলেজটিতে। গভমেন্ট কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট থাকাকালীন পুরনো একমাত্র ভবনটিতেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
এদিকে, কলেজটির অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতে উদ্যোগও নেয় সরকার। নতুন একটি ভবন নির্মাণে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে কার্যাদেশও দেয়া হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে এর কার্যাদেশ দেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। কার্যাদেশ পায় এম এন ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কার্যাদেশের প্রায় দুই বছর হতে চললেও অদ্যাবধি ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভবনটি হবে ৬ তলা বিশিষ্ট। তবে শুরুতে পাইলিং ও নিচ তলার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এক কোটি টাকার এ প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়েছে এম এন ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রথম তলার নির্মাণ কাজ শেষ হলে পরবর্তীতে উপরের তলার টেন্ডার আহ্বান ও কার্যাদেশ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার সরকার। তিনি ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর এ পদে (নির্বাহী প্রকৌশলী) যোগদান করেন।
কার্যাদেশ প্রদানের পরও দীর্ঘ দিন নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার সরকার আজাদীকে বলেন, আমার দায়িত্ব ভার গ্রহণের আগে থেকেই কাজটি স্তিমিত ছিল। সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না। তবে আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্মাণ কাজ শুরুর উদ্যোগ নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেছি। তারা এরইমধ্যে পাইলিংয়ের কাজ করেছে। এর মাধ্যমে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে বলেও দাবি নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার সরকারের। যদিও সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের বিদ্যমান পুরনো ভবনের ডান পাশে পাইলিংয়ের জন্য একটি যন্ত্র (পাইলিং টাওয়ার) দাঁড় করে রাখা হয়েছে। পাশেই বালির স্তূপ। কলেজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মাসে (জুনে) একটি পাইলিংয়ের কাজ করা হয়েছে। আর বালির স্তূপ করা হয়েছে। কিন্তু এরপর তাদের (নির্মাণ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের) আর দেখা যায়নি। কার্যাদেশ পেলেও এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ তারা করছেন না বলে জানিয়েছেন এম এন ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন। তাঁর দাবি কাজটি তারা পেয়েছেন ঠিকই। তবে ‘প্রভাবশালী’ একজনের অনুরোধে আরেক পার্টিকে কাজটি দেয়া হয়েছে। তারাই কাজটি করছেন। নির্মাণ কাজ বিলম্বের কারণ হিসেবে ইমতিয়াজ উদ্দিনের দাবি কার্যাদেশ পেলেও ভবনটির অনুমোদিত ডিজাইন পেতে দেরি হয়েছে। যার কারণে নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছর (৫ মাস আগে) এর অনুমোদিত ডিজাইন পাওয়া গেছে দাবি করে তিনি বলেন, এরপরই পাইলিংয়ের কাজ করা হয়েছে। এখন পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।
যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই দাবি পুরোপুরি সঠিক নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, অনুমোদিত ডিজাইন পেতে বিলম্বের কথা বললেও রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখে। তাছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে পার্টিকে কাজটি দেয়া হয়েছে, তারা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত। সব মিলিয়ে তাদের মর্জিতেই এর নির্মাণ কাজ আটকে আছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্মাণ কাজ শুরুতে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জালাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে এতটা দেরি হওয়ার কথা না। কার্যাদেশ দেয়ার পরও কাজ শুরুতে বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেয়া কার্যাদেশ বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানও করা যায়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর চাইলে যে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যমান চার তলা ভবনটির নিচতলা জুড়ে রয়েছে প্রশাসনিক ব্লক। যেখানে ছোট্ট একটি কক্ষে বানানো হয়েছে অধ্যক্ষের কার্যালয়।
রয়েছে শিক্ষক মিলনায়তন ও লাইব্রেরি। ছাত্রীদের কমনরুমও (মিলনায়তন) বানানো হয়েছে নিচ তলায়। সবমিলিয়ে নিচ তলায় ক্লাস নেয়ার উপযোগী কোনো কক্ষই অবশিষ্ট নেই। বাকি তিনটি ফ্লোরে মোট ৮টি কক্ষ রয়েছে ক্লাস নেয়ার উপযোগী। প্রতিটি ক্লাস রুমে ৭০/৮০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বসানোর সুযোগও নেই। একটি ক্লাস রুমকে বানানো হয়েছে ল্যাব।
যা বলছেন কলেজ সংশ্লিষ্টরা : কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জসিম উদ্দিন খানের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসময় অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ছিলেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক রেহানা আখতার ইয়াছমীন, শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ও দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. জাহিদ উদ্দিন সুলতান, উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রসেনজিৎ পাল, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহিদ আহম্মদ ও গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
কলেজের নানাবিধ সংকটের কথা তুলে ধরে এই শিক্ষকরা বলছিলেন, আগে সর্বোচ্চ এক হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য এই ভবনটি উপযোগী ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষার্থী প্রায় তিনগুণ। সে হিসেবে কয়েকগুণ বেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে গেলে নতুন অবকাঠামো-ভবন জরুরি। কিন্তু টেন্ডার-কার্যাদেশ
সম্পন্ন হলেও নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। এর জন্য কলেজকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শ্রেণি কক্ষ সংকটে ব্যহত হচ্ছে পাঠদান। একটি সেকশানকে দুটি করে পাঠদান করতে হচ্ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটও প্রকট। সরকারি পর্যায়ে মাত্র একজন কর্মচারী রয়েছে। এটিও বড় ধরনের সমস্যা। অবশ্য, নিরুপায় হয়ে দৈনিক ভিত্তিক ১৩ জন কর্মচারী রাখা হয়েছে।
সবমিলিয়ে নানাবিধ সংকটে কলেজটির বর্তমান ‘দূরাবস্থা’ তুলে ধরেন অধ্যক্ষ ও শিক্ষকবৃন্দ। এসব সংকটের সুরাহা চেয়ে শিক্ষার্থী অনুপাতে দ্রুত অবকাঠামো, শিক্ষক-জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কলেজ প্রশাসনের তথ্য মতে, কলেজটিতে অধ্যক্ষসহ বর্তমানে ২৫ জন শিক্ষক আছেন। সরকারি কলেজে রূপান্তরের ৬ বছরেও সৃষ্টি হয়নি উপাধ্যক্ষের পদ। উপাধ্যক্ষের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক কোনো পদও এখন পর্যন্ত সৃজন হয়নি। ৭টি পদ থাকলেও তা বিষয় ভিত্তিক নয়। তবে এই ৭টি পদও কর্মাশিয়াল ইনস্টিটিউট থাকাকালীন পুরনো। কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর জসিম উদ্দিন খান জানান, বিদ্যমান ৭টি পদে ৫ জন শিক্ষক আছেন। আর ২০ জনকে সংযুক্তিতে (এটাচমেন্টে) দেয়া হয়েছে।
কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কলেজটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, আইসিটি, ফাইনান্স ব্যাংকিং ও বীমা বিষয়ে বিষয় ভিত্তিক কোনো শিক্ষক নেই। বাংলা, হিসাব বিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, রসায়ন ও যুক্তিবিদ্যা/দর্শনে শিক্ষক আছেন একজন করে। ইংরেজি, গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে ২ জন করে শিক্ষক আছেন। যদিও প্রতি বিষয়ে ৩ জন করে শিক্ষক থাকার কথা। তবে আইসিটি ল্যাব থাকলেও এ বিষয়ে একজন শিক্ষকও নেই কলেজে। আবশ্যিক হওয়ায় তিন বিভাগের (বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের) শিক্ষার্থীদেরই বিষয়টি (আইসিটি) পড়তে হয়। কিন্তু শিক্ষক না থাকায় তিন বিভাগের শিক্ষার্থীদেরই বিষয়টি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচন্দনাইশে মামলা থেকে রেহাই পেতে আসামীপক্ষের সংবাদ সম্মেলন
পরবর্তী নিবন্ধখাল ও ড্রেনেজ সিস্টেমের অব্যবস্থাপনায় ঢুকছে জোয়ারের পানি : মেয়র