
“খতদিন অইয়েদে বাড়িত ন যাইদ্দি মা’র হাতর ফুনি দি বাইয়ূন ন খাইদ্দি খতদিন অইয়েদে বাড়িত ন যাইদ্দি মা’র হাতর ফুনি দি বাইয়ূন ন খাইদ্দি দুই চোখত ভাসেদ্দে আঁর ফইর ফারআঁত্তে কিছু গম ন লাগের গম ন লাগের আর খতদিন অইয়েদে বাড়িত ন যাইদ্দি মা’র হাতর ফুনি দি বাইয়ূন ন খাইদ্দি”– গীতিকার আসিফ ইকবালের লেখা।
গায়ক নকিব খানের কণ্ঠে গাওয়া গানটি শুনলে সত্যি যে কেউ আবেগ আপ্লুত হবে। আহা কত আবেগ জড়ানো কথা মায়ের হাতে শুঁটকি দিয়ে বেগুন রান্নার মজাই আলাদা। খনার বচনে আছে, “যেছায় তেছা মিলে শুটকি আর বেগুনে মিলে।” বেগুনের সাথে যে শুটকির একটা মধুর সম্পর্ক আছে বলার অপেক্ষা রাখে না। চট্টগ্রামের ফুতাবেগুন (একপ্রকার ছোটো গোলাকার আকৃতি বেগুন) দিয়ে শুটকি মাছের তরকারী মানে অমৃত। ভালো মানের শুটকি মাছ রান্না করলে আশপাশে দু–চার বাড়ি খবর হয়ে যায়। শুটকি সুঘ্রাণে জ্বিে জল আসে। শুটকি বললে কথা নেই চাঁটগাবাসীদের কাছে অমৃত ভোজন রসদ। বিশেষ করে শীতকালে বেগুন শিম টমেটো আলো ধনে পাতা দিয়ে শুটকি রান্না করলে মাছ মাংস কোর্মা পোলাও লাগে না। অনেক স্বাদ করে রসনা বিলাস করা যায়। লইট্যা শুঁটকি নিয়ে বাংলা ইংরেজি মিশ্রিত খনার বচন আছে– “হোয়াট ইজ দিস ? দিস ইজ ড্রাই লইট্ট্যা ফিস। তুই ন হাইলে আঁরে দিস।”
ফুনি (শুটকি) ইতিকথা:
ফুনি শব্দের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক আভিধানিক অর্থ–শুটকী। আদিকাল থেকে প্রচলিত আছে মাছে– ভাতে বাঙালি। মাছ হচ্ছে শুটকি তৈরির একমাত্র উপকরণ। আদিমযুগে মাছ শিকার করা হতো পাথর দিয়ে কিংবা লাঠি দিয়ে আঘাত করে। পানিতে নেমে মাছ ধরা শুরু হলো জাল আবিষ্কারের পর। আজকাল নানারকমের জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। বেশি মাছ ধরা হলে তা রোদে শুকিয়ে ফুনি বা শুটকি তৈরী হয়। গবেষক আবদুল হক চৌধুরী রচনাবলী থেকে জানা যায়, শীতকালে নতুন ফাইস্যা শুঁটকীর চুঁয়াবর্তা আরাকানীদের নিকট একটি উপাদেয় তরকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। চুঁয়ার তৈরী শুঁটকীর ভর্তাকে চুঁয়াভর্তা বলা হয়। বর্তমানে ফুনির চুয়াভর্তা বিলুপ্ত।
মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে পারল শুটকি মানে এক বৈচিত্র্যময় স্বাদ। শুটকির কথা শুনলে জিবে জল আসে। শুটকি মাছ এখন চট্টগ্রামের মানুষের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলার মানুষের কাছে প্রিয়। তবে শুটকি মাছ চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতির অংশ। চট্টগ্রামের শুটকি মাছ মানে সেরা। চট্টগ্রামে অনন্য জেলার মানুষ বেড়াতে আসলে শুটকি মাছ খায়। আবার যাওয়ার সময় কিনেও নিয়ে যায়। শুটকি মাছ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বেশি উৎপাদন হয়। বিশেষ করে নদী সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ করে খররোদের মধ্যে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির প্রচলন হয়ে আসছে। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, তাজিয়াকাটা, দরবেশ কাটা, কুতুব জোম, বড় ঘোপ, খুদিয়ার টেক, আলী আকবর ডেইল, তাজ্জাখালী, পশ্চিম ধুরুং, শাহ পরীর দ্বীপ, জিঞ্জিরা, নাজিরার টেক, কুরুসকুল, সমিতিপাড়া, চৌফলদণ্ডী, সেন্টমার্টিনসহ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শুটকি উৎপাদন হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলি তীর বিশেষ করে ইছানগর গ্রামের ডাঙ্গাচর, জুলধা, কর্ণফুলি এলাকায় বাঁশের চাঙ্গে শুটকি শুকানো হয়। পটুয়াখালি কুয়াকাটা, বরগুনার তালতলী ও পাথরঘাটা, সুন্দরবনের দুবলা চর, রাঙ্গাবালি সহ সমুদ্র উপকূল এলাকায় প্রচুর পরিমাণে শুটকি উৎপাদন হয়ে থাকে। শুটকি মহল শুটকি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। হাতেগোনা কয়েকটি জেলা থেকে সমগ্র দেশে শুটকি সরবরাহ হয়ে বর্তমানে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
প্রাকৃতিক উপায়ে শুকানো শুটকি মাছের স্বাদ বেশি হয়। শুটকি মাছে পোকা বা ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, ছত্রাক ইত্যাদি যাতে আক্রমণ না করে সে জন্য উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। শুটকি মাছ বছর দুয়েক পর্যন্ত খাবারের উপযোগী থাকে। সামুদ্রিক মাছের শুটকি বেশি করা হয়। লইট্ট্যা, চেপা, পোপামাছ, হাঙর, নাইল্যা, ছুরি, ফাইস্যা, বাইল্যা, ইছা, রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, অলুয়া, কোরাল, লাক্ষ্যাউ, ট্যাংরা, বাঁশপাতি, সামুদ্রিক বাইল্যা, চাপিলা, মলা, ইলিশ ও নোনা ইলিশ, সুরমা, ভোল, পুঁটি মাছের শিদলসহ পুকুর এবং সমুদ্রের প্রায় ৪০–৭৫ রকমের মাছের শুটকি রয়েছে। চট্টগ্রামে পাঁচমিশালি শুটকির বেশ চাহিদা রয়েছে।
মাছ থেকে শুটকি যেভাবে হয়:
সমুদ্রের তাজা মাছই শুটকির প্রধান উপকরণ। সে জন্য শুটকি তৈরির জন্য সামুদ্রিক মাছ সংগ্রহ করতে হয়। মাছের গুণগত মান ভালো হলে শুটকির মানও ভালো হয়। তাজা মাছ শুটকি তৈরির উপযোগী করে প্রক্রিয়াজাত করার শুরুতেই মাছের পেট পরিষ্কার করতে হয়। মাছের আঁইশ, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় অংশ শরীর থেকে ফেলে দিতে হয়। মাছ কতটা ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে, তার ওপর শুটকি মাছের স্বাদ ও গন্ধ অনেকাংশেই নির্ভর করে।
মাছ পরিষ্কার করার পর তাজা মাছ ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করার জন্য লবণ পানিতে প্রায় দশ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখতে হয়। লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলে মাছ সহজে জীবাণুর আক্রমণের শিকার হয় না। নির্দিষ্ট সময় লবণ পানিতে রাখার পর মাছগুলো পানি থেকে তুলে রোদে শুকানো হয়।
সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে প্রখর রোদ পাওয়া যায়, সেখানকার শুটকি পল্লিগুলোতে মাছ শুকানোর জন্য বাঁশের তৈরি মাচা কিংবা বাঁশ বা রশির ব্যবস্থা করা হয়। এসবের ওপর অথবা সঙ্গে তাজা মাছ ঝুলিয়ে শুটকি তৈরির জন্য শুকানো হয়। বেশির ভাগ মাছ লেজের সঙ্গে বেঁধে মাথার অংশ নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। শুটকি পল্লির জেলেদের ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি মাচাকে ‘খলা’ বা ‘চাতাল’ বলা হয়।
প্রখর রোদে চার–পাঁচ দিন শুকানোর পর মাছ শুটকিতে পরিণত হলে তা ঠান্ডা করে উপযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করা হয়। এভাবেই তাজা সামুদ্রিক মাছ নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুকিয়ে শুটকিতে পরিণত হয়।
শুটকি মাছের ব্যবসা ও চাহিদা : আদিকাল থেকে শুটকি মাছের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে ব্যাপক বলা যায়। অর্থনীতিতে বেশ লাভজনক ভূমিকা রেখে চলেছে শুটকি ব্যবসায়ীরা। শুটকি শুধু ভোজনরসদ বা স্বাদের খাবার নয়। এটা ব্যাবসায়িকভাবেও সফলতা এনেছে। দেশে শুটকিপ্রেমীদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বিভিন্ন বড়ো বড়ো কোম্পানি শুটকি মাছকে অত্যাধুনিকভাবে কৌটা বা প্যাকেটের মাধ্যেমে, মধ্যপ্রাচ্য, বাহরাইন, ওমান, দুবাই, ইউরোপে, আমেরিকা, চীন, শ্রীলঙ্কা, হংকংসহ নানাদেশে রপ্তানি হচ্ছে। প্রবাসীদের কাছেও শুটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ধারাবাহিকভাবে শুটকি উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুটকি মাছের উৎপাদন পূর্বের তুলানায় অনেকটা বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ ও চাক্তাইকে বলা হয় শুটকির বন্দর। শীতে শুটকির চাহিদা বেশি থাকে। চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে প্রতিদিন গড়ে প্রায় শতকোটি টাকার শুটকি বেচাকেনা হয়।
৩০০ জনের বেশি রয়েছে পাইকারি ব্যবসায়ী ৫০ এরও বেশি রয়েছে আড়তদার। ২০২২ সালে শুধু সুন্দরবনের চারটি চরে ৬৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন। চলতি মৌসুমে ২০২১–২২ অর্থবছরে চার কোটি ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫৪ টাকা রাজস্ব পেয়েছে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ। শুধু সুন্দরবনের দুবলাচর এলাকায় ১২ হাজার জেলে শুটকি উৎপাদনে নিয়োজিত থাকে। তাছাড়া গত ২০১৯–২০ অর্থ বছরে প্রায় ১০০০ হাজার কোটি টাকার শুটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শুটকি মাছের গুঁড়া ফার্মের মুরগি এবং মাছের খাদ্য হিসেবে বেশি চাহিদা রয়েছে।
শুটকি ব্যবসায়ী পটিয়া ছনহরা গ্রামের নাজিম উদ্দিন জানান, “আছাদগঞ্জে ৫০টি শুটকির আড়ত আছে। দোকানও হবে ৩৩১টিরও বেশি। পাইকারী–খুচরা আড়ত মিলিয়ে বছরে হাজার কোটি টাকার শুটকি বেচাকেনা হয়। ভারত ও বার্মা থেকে শুটকি বেশি আমদানী হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের শুটকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শুটকি উৎপাদন বাড়াতে জেলেদেরকে উৎসাহিত করলে ভালো হতো। শুটকি ব্যবসা রমরমা হতো”।
জেলেদের স্বল্প হার সুদে ঋণ এবং বিদেশে শুটকি রপ্তানি করতে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। শুটকি উৎপাদনে জেলেরা যাতে কীটনাশক ব্যবহার না করে সে জন্য বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে যদি শুটকি উৎপাদন করা যায় তাহলে দেশে শুটকির চাহিদাও আরও বেড়ে যাবে। সরকারিভাবে চট্টগ্রামের শুটকি ব্যবসায়ীদেরকে উৎসাহ ও প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক হলে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় শুঁটকি শিল্প প্রসারে আগামীতে বাংলাদেশে ‘বৃহত্তর চট্টগ্রাম’ হবে ‘শুটকি শিল্পের রোল মডেল’। স্বাদে গুণে রসনা জৌলুসে অনন্য আঁরার ফুনি আঁরার ঐতিহ্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক













