সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাইশার মা বিলাপ করতে করতে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘ও ঝি, তোর ভাইরে কনে চাইবো, আঁর ঝিরে আই চামু তো, আঁর ঝিরে আঁই শোকেসে সাজায় রাখমু।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মাইশার মা সালমা আক্তারের কান্না আশপাশের মানুষকেও আবেগতাড়িত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়া মেয়েকে নিয়ে তাদের স্বপ্নের অন্ত ছিল না। কিন্তু সেই মেয়ের এভাবে মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। আকুতি করছিলেন নিজের মেয়েকে দেখার। মেয়ের নিথর দেহ শোকেজে সাজিয়ে রাখার কথাও বলছিলেন। একমাত্র মেয়ে মাইশা মুশফিরাতকে হারিয়ে দিশেহারা মা। সৎ বাবা দিদারুল আলমও আহাজারি করছিলেন।
কুমিরায় আইআইইউসি প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া মিনিবাসের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান মাইশা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকায়।
মাইশার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তার মা সালমা আক্তার। মেয়ের জন্মের পর থেকেই তাকে ঘিরে ছিল মায়ের নানা স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
মাইশার বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। তখন মাইশা পড়তেন পঞ্চম শ্রেণিতে। মাইশার বাবা সাফায়াত হোসেন মারা গেলে মাইশার মা প্রবাসী দিদারুল আলমকে বিয়ে করেন। দিদারুল আলমের তিন পুত্র সন্তান এবং মাইশা সৎ মেয়ে। সৎ মেয়ে হলেও মাইশাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করছিলেন দিদারুল আলম। মাইশা যে সৎ মেয়ে তা তিনি কখনো মনে করেননি, নিজের তিন পুত্র ও মাইশাকে একইভাবে লালন পালন ও লেখাপড়া করাচ্ছিলেন।
গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ফোনে মেয়ের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন মা। সেখানে মেয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিল না তাকে। মায়ের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছিল সেই আক্ষেপ, ‘আমার মেয়ে আর তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না। আমার স্বপ্নও পূরণ হলো না।’
মেয়ের শেষ জন্মদিনের স্মৃতিও এখন কাঁদাচ্ছে পরিবারকে। গত শুক্রবার ছিল মাইশার জন্মদিন। একমাত্র মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে আনন্দঘন আয়োজন করেছিলেন মা। মেয়ের সেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাস এখন স্মৃতির পাতায়।
মাইশা পরিবারের সকলের খুবই আদরের ছিল উল্লেখ করে কান্না করতে করতে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের মধ্যমণি ছিল মাইশা। গেল শুক্রবার সে জন্মদিন পালন করেছে। আত্মীয়স্বজন সবাই এসেছিলেন। সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল আমার মেয়ে। জন্মদিনের আমেজ কাটার আগেই তাকে পরপারে চলে যেতে হলো। আল্লাহ যেন আর কোনো মা–বাবার কোল এভাবে খালি না করে।
বাবার পাশে চিরনিদ্রায় : মীরসরাই প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মাইশার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাদ এশা গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাবা শাফায়াতের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।












