শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার

| শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। শিক্ষার্থী কমেছে স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতায় শিক্ষার পরিকল্পনা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫ প্রতিবেদনের সঙ্গে আগের বছরের তথ্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে মূলত মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূরক তথ্য হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও প্রকাশ করেছে ব্যানবেইস। মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে শিক্ষক ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় শিখন ঘাটতি, সামপ্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের একাংশের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে। এর আগে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। ১ হাজার ৩৫০ জন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, এসব পরীক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের (৫৪৯) বিয়ে হয়ে গেছে। এদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি–বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন ১৯ হাজার ২১১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, আর শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি। স্কুল অ্যান্ড কলেজেও আছে মাধ্যমিক স্তর। সেখানেও একই প্রবণতা। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি, আগের বছর যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়ে ১ হাজার ৫১৪টি থেকে ১ হাজার ৫৫৬টি হয়েছে। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি উদ্বেগজনক। নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীর চাহিদা, জনসংখ্যার পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং শিক্ষার মান কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কমে যাওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। ধারণা করা হয়, দারিদ্র্যের কষাঘাত, পারিবারিক বিপর্যয় এবং শিক্ষাসামগ্রীর দুষ্প্রাপ্যতা অনেককে ঝরে পড়তে বাধ্য করছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে এবং মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় অনেকের মাঝে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে কেন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন জরুরি। ঝরে পড়া রোধে কাউন্সেলিং, বৃত্তি প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ও মানসিক সাহস জোগাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তাঁরা বলেন, বিনামূল্যে বই বিতরণ, মিড ডে মিল, উপবৃত্তি প্রদান সহ নানামুখী কার্যকর উদ্যোগের কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে সরকারের যে উদ্যোগ, তা প্রশংসনীয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে এসব শিক্ষার্থীকে বিদ্যাপীঠে ফিরিয়ে আনতে না পারলেও কমে যাওয়ার কারণ উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন করে শিক্ষার্থী যেন না কমে, বা ঝরে পড়ার হার যাতে না বাড়ে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। ব্যাপক প্রচারণা, অভিভাবকদের সচেতন করা, এককালীন আর্থিক অনুদান, সহজ শর্তে শিক্ষা ঋণ প্রদান, উপবৃত্তির পরিসর ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি সহ পূর্ব থেকে বিদ্যমান সুবিধাগুলো জোরদার করা হলে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করা সম্ভব। এছাড়া সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে শিক্ষার্থীদের নিকট উপস্থাপন করা গেলে তা ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে