শতবর্ষী জেএম সেন হলে আজ আসছেন প্রধানমন্ত্রী

এ প্রথম কোনো সরকারপ্রধান পরিদর্শন করবেন চট্রগ্রামের পূজামণ্ডপ ৯৩ সালে এখানে জন্মস্টমীর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন খালেদা জিয়া নগরীতে সাংগঠনিক সভায়ও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ২০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নগরের রহমতগঞ্জে বহু ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষ পেরোনো যাত্রা মোহন সেন হল (জে এম সেন হল)। আসাম–বেঙ্গল রেলওয়ে আন্দোলন, চা শ্রমিকদের মুল্লুক চলো আন্দোলন, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের প্রথম এ টাউন হলের সঙ্গে। ১৯৮৪ সালে জে এম সেন হলে শুরু হয় জন্মাষ্টমী উৎসব। ১৯৯৩ সালে জন্মষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। এর তিন দশক পর মা বেগম খালেদা জিয়ার পদচিহ্ন অনুসরণ করে আজ মঙ্গলবার জে এম সেন হলে আসছেন তিনি, সেখানে পরিদর্শন করবেন পূজামণ্ডপ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে চট্টগ্রামের দুর্গোৎসবে যোগ দেবেন তিনি।

পূর্ব ঘোষিত শিডিউল অনুযায়ী, আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছার কথা প্রধানমন্ত্রীর। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আজ দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম পা রাখবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর আগে গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম আসেন তিনি। আজ প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা–কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও বিরাজ করছে উৎসাহ–উদ্দীপনা। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাঝে উৎসাহের কমতি নেই। কারণ স্বাধীন দেশে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবে যোগ দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে তাই সানন্দ অভ্যর্থনায় চট্টগ্রামবাসী একসুরে বলছেন– ‘বীর চট্টলায় স্বাগতম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জে এম সেন হলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে নগরের র‌্যাডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠেয় সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন। সেখানে অংশ নেবেন চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এই সভায় তৃণমূলের নেতারা সরাসরি দলীয় প্রধানের সামনে নিজেদের মতামত, পরামর্শ ও স্থানীয় রাজনীতির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। এ জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ও আত্মিক ইতিহাসের সাথে চট্টগ্রাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেই অমর অধ্যায়–স্বাধীনতার ঘোষণা। বিএনপি প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তনেও চট্টলা ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি’র সাবেক চেয়ারপার্সন, জিয়াউর রহমানের সহধর্মিনী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে দেয়া হয় ‘দেশনেত্রী’ উপাধি। ১৯৮১ সালে ‘কিছু বিপথগামী’ সেনা সদস্যের হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসেই নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন জিয়াউর রহমান। ফলে জিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য, বিশেষ করে তারেক রহমানের কাছে চট্টগ্রাম কেবল একটি বিভাগীয় শহর নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও অনুভূতির এক সংবেদনশীল মানচিত্র। তাই জিয়া পরিবারের সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের আজকের সফর কেবল সাংগঠনিক বা মানবিক নয়, বরং অত্যন্ত গভীর এক অনুভূতির পুনর্মিলন।

চট্টগ্রামের প্রতি এ অনুভূতির টানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া বারবার ছুটে আসতেন চট্টগ্রাম। গত ৯ জানুয়ারি তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আসেন তিনি। পরদিন পলোগাউন্ডে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। সর্বশেষ আসেন গত ৯ আগস্ট।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস : প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে। তারা বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো সরকার প্রধান চট্টগ্রামের দুর্গোৎসবে আসেননি। এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন, এতে তারা আনন্দিত। গতকাল দপুরে সাগরিকায় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জাানিয়ে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন কয়েক হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি আজাদীকে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান আমাদের চট্টগ্রামের শারদীয় দুর্গোৎসবে আসেননি। উনি (তারেক রহমান) প্রথম আসছেন। এটা আমরা পূজা কমিটির পাশাপাশি চট্টগ্রামের যারা সনাতনী আছি, সবাই খুব খুশি এবং সবাই এটাকে গৌরবের বিষয় মনে করছি। আমরা সবাই আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রীকে আমরা যথাযথ সম্মান দেখিয়ে উনাকে স্বাগত জানাব, সম্মান দেখাব আমরা। আর উনার অনুষ্ঠানে কোনো ত্রুটি রাখব না অনুষ্ঠানটা খুব সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করব। উনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা একটাই–আমরা অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ চাই, হিন্দু–মুসলিম–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান সবাই যাতে এ দেশে একপ্রাণ হয়ে থাকতে পারি, মিলেমিশে থাকতে পারি, সেটাই উনার কাছে আমরা চাইব।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় অভয়মিত্র মহাশ্মশান পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সৌরভ প্রিয় পাল আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে বীর চট্টলার সনাতনী সমপ্রদায় খুবই উচ্ছ্বসিত। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান এই প্রথম দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেএমসেন হলে সনাতনী সমপ্রদায়ের এত কাছে আসছেন। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সনাতনী সমপ্রদায় বিএনপিকে উজাড় করে ভোট দিয়েছে, বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সনাতনী সমপ্রদায়ের প্রধান প্রত্যাশা হল নিরাপত্তা। ইতোমধ্যে দুর্গাপূজার ছুটি বৃদ্ধি, অনুদান বৃদ্ধি, পুরোহিত ও সেবায়েতদের ভাতা প্রদানসহ সনাতনী সমপ্রদায়ের কল্যাণে সকল পদক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড অবস্থিত জাতীয় মহাতীর্থ চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সিঁড়ি, রাস্তাসহ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জেএমসেন হলে একটি ২০ তলা বিশিষ্ট মাল্টি কমপ্লেঙ দীর্ঘদিনের স্বপ্ন সনাতনী সমপ্রদায়ের। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষণা দিবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জে এম সেন হলে প্রবেশের পরই পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চের সামনে বসবেন। মঞ্চে দুটি নৃত্য পরিবেশন ও গীতাপাঠ হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীকে মঞ্চে উঠবেন। উত্তরীয় ও স্মারক শুভেচ্ছা গ্রহণ করে তিনি বক্তব্য রাখবেন। প্রধানমন্ত্রীকে বৃক্ষ উপহার দেয়ারও কথা রয়েছে। পরিষদের সভাপতি অর্পণ কান্তি ব্যানার্জির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত সভা শেষ হবে।

চট্টগ্রাম–১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান আজাদীকে বলেন, ১৯৯৩ সনে আমার বাবা আবদুল্লাহ আল নোমানের প্রচেষ্টায় এবং আমন্ত্রণে জেএমসেন হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এসেছিলেন। তার ৩৩ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে একটি বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সমপ্রদায়ের সর্ববৃহৎ উৎসবে যোগদান করছেন। এই চিন্তাটাই হলো সাধারণ মানুষ এবং আমাদের শরীরের একটি অঙ্গ অর্থাৎ সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও আমাদের।

কী বার্তা থাকবে সাংগঠনিক বৈঠকে : নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি আজাদীকে বলেন, সাংগঠনিক সভা থেকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামূলক ম্যাসেজ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে দলের দায়িত্বে থাকা নেতারা যেন কোনো অবস্থাতেই বিশৃঙ্খলাকারীদের দলে প্রশ্রয় না দেন এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক থাকেন, সে বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দিতে পারেন।

সাংগঠনিক সভায় করা উপস্থিত থাকবেন জানতে চাইলে বলেন, শুধুমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ঢুকতে পারবেন, এর বাইরে কেউ ঢুকতে পারবে না। গতবার একাধিক জন কার্ড বিতরণ করায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা হয়, এবার যেন সেরকম কিছু না হয় তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। আমরা তালিকা করেছি এবং নির্ধারিত দুজনের সিগনেচারে অনুমোদিত নির্দিষ্ট ‘এন্ট্রি পাস’–এর মাধ্যমেই কেবল প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর পুরো সফরের মূল্যায়ন করে এরশাদ উল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁর ঘোষিত ‘৩১ দফা’ ও ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিশ্রুতির আলোকে সকল ধর্মের প্রতি সম্মান জানানো। পাশাপাশি গত নির্বাচনে হিন্দু সমপ্রদায় তথা সকল ধর্মের মানুষ যেভাবে উনাকে জয়যুক্ত করার জন্য সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ, শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানানোর জন্যই এই সফর।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম আজাদীকে বলেন, সাংগঠনিক সভায় চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র পূর্ণাঙ্গ কমিটি অংশ নেবেন। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সুপার ফাইভ অংশ নেবেন। থাকবেন সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। যেহেতু চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপিতে সাংগঠনিক কমিটি নেই তাই সেখানকার সিনিয়র নেতৃবৃন্দ অংশ নেবেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে নগর ও জেলায় নেয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেয়া হবে জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি : প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধঈদগাঁওয়ে সড়কে দিনেদুপুরে দুই দফা গণডাকাতি