লিমন-বৃষ্টি হত্যা : আদালতের নথিতে নৃশংসতার ভয়াবহ বিবরণ

স্মৃতি ধরে রাখতে বৃষ্টির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেরত চান বাবা

| মঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে আদালত। ফ্লোরিডার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাম্পা বে টোয়েন্টিএইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যার পর কীভাবে লিমনের লাশ পলিথিনের ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ফেলে আসা হয়েছে তার বিবরণ উঠে এসেছে আদালতের নথিতে। এদিকে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চলাকালে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে। তবে তা বৃষ্টির কি না, তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এঙামিনার অফিস মরদেহটি শনাক্তের কাজ করছে। খবর বিডিনিউজের। এ জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার লিমনের রুমমেট ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির পরিকল্পিত খুনের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, তার বাসার ভেতরেই দুজনকে হত্যা করা হয়। পরে শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের পাশ থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্য ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা যায়, হিশাম আবুগারবিয়েহ ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ক্লিনিং সরঞ্জাম দিয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করেন এবং আগে থেকে কিনে রাখা বড় কালো আবর্জনা ফেলার পলি ব্যাগে লিমনের মরদেহ ভরে ফেলেন। পরে মরদেহটি ব্রিজের উত্তর পাশে ফেলে আসা হয়। গোয়েন্দারা যখন কালো রঙের ওই ভারী আবর্জনা ফেলার ব্যাগ খুঁজে পান, তখন সেখান থেকে পচা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আদালতের নথিতে বলা হয়, আবুগারবিয়েহ নিহত দুজনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরে (আবর্জনা বা বর্জ্যকে সংকুচিত করে ফেলার বৈদ্যুতিক যন্ত্র) ফেলে দেন। সেখানে যে রক্তের নমুন পাওয়া গেছে, তাতে বৃষ্টি ও লিমন দুজনের উপস্থিতির বিষয়েই নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। লোকেশন ট্র্যাক করে লিমন ও বৃষ্টির মোবাইল ফোনের কাছাকাছি এবং লিমনের মরদেহ ফেলে আসার স্থানে হিশামের ফোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ওই ফোনের মাধ্যমেই তিনি অনলাইনে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কিনেছেন এবং লাশ গুম করার উপায় নিয়ে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তদন্তকারীরা আবুগারবিয়েহর ফোন থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করেছেন। খুনের কয়েকদিন আগে ৭ এপ্রিল তিনি অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ এবং ১১ এপ্রিল ট্র্যাশ ব্যাগ ও জ্বালানি তেল অর্ডার করেন। ১৫ এপ্রিল তার কাছে একটি নকল দাড়ি পৌঁছায়। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হল, ১৩ এপ্রিল আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘মানুষকে কালো প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়?’ চ্যাটজিপিটি একে ‘বিপজ্জনক’ বললে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তারা জানবে কীভাবে?’

১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে আবুগারবিয়েহর ফোনের লোকেশন হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর পাওয়া যায়। এছাড়া ১৯ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে স্নাইপারের গুলি থেকে কেউ বাঁচে কিনা বা বন্দুকের শব্দ প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে কিনাএমন প্রশ্নও করেছিলেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, আবুগারবিয়েহর গাড়ির ড্রাইভ ডেটা এবং লিমনের ফোনের লোকেশন মিলে গেছে। নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও ও সেলফোন রেকর্ডও লিমন ও বৃষ্টির শেষ অবস্থানের সঙ্গে আবুগারবিয়েহর যোগাযোগের ইংগিত দিচ্ছে। কৌঁসুলিদের দাবি, আবুগারবিয়েহ পুলিশের কাছে মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আলামত ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন।

লিমনের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ধারালো অস্ত্রের বহুবিধ আঘাতের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিশাম আবুগারবিয়েহর জন্য জামিনহীন আটকাদেশ চেয়েছেন কৌঁসুলিরা। তাদের যুক্তি, আবুগারবিয়েহর মুক্তি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।

স্মৃতি ধরে রাখতে চান বাবা : এদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির লাশ এবং তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেশে ফেরত আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন বাবা জহির উদ্দিন আকন। গতকাল সোমবার মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায় বৃষ্টির বাড়িতে যান। এ সময় বৃষ্টির বাবা বাড়িতে না থাকায় তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি। জহির উদ্দিন আকন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ এখনো তার মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। তিনি বলেন, আমার মেয়ের মরদেহ যেন দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি তার ব্যবহৃত জিনিসপত্রও ফেরত দেওয়া হোক। এগুলোই আমাদের শেষ স্মৃতি হিসেবে রাখতে চাই। তিনি এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন, আর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। ২৭ বছর বয়সী লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসে তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বাংলাদেশ থেকে ফ্লোরিডার একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, লিমন ও বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক সাড়ে চার বছরের। তারা বিয়ে করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও দ্বিমত ছিল না। তবে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেই তারা বিয়ের কাজটি সারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধভ্যাপসা গরমের মধ্যে বৃষ্টি, ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা