কক্সবাজারে মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত থাকার মধ্যেই সরকার দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এই আমদানির ফলে সামনের মৌসুমে উৎপাদনের অনীহায় ভুগবেন চাষিরা।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন মৌসুমের লবণ বাজারে আসার আগে আমদানি করা লবণ বাজারে ঢুকলে স্থানীয় লবণের দাম কমে যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে মজুত রাখা লবণ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে দেশের মোট লবণের প্রায় ৮৭ শতাংশ উৎপাদিত হয়। গত মৌসুমে প্রায় ৪২ হাজার চাষি লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। এরই মধ্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মৌসুমের উৎপাদিত লবণ বাজারে আসার কথা রয়েছে।
বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশে পরিশোধিত লবণের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণ সাড়ে ৭ লাখ টন, শিল্পে ব্যবহারের জন্য সাড়ে ৯ লাখ টন, মাছ চাষে ৩৭ হাজার টন এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ৩ লাখ ৬ হাজার টন। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে দেড় লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর বিসিকের নিবন্ধিত ও চালু মিলের অনুকূলে এ আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে এসব লবণ আমদানি প্রায়ই চূড়ান্ত। কুতুবদিয়ার বড়ঘোপের লবণ ব্যবসায়ী ইদ্রিস হোসেন বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত লবণ মজুত থাকা সত্ত্বেও আমদানি করলে প্রান্তিক চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। মাঠে বিপুল পরিমাণ লবণ আছে। তারপরও সরকার কি প্রয়োজনে লবণ আমদানি করছে, বোধগম্য নয়।
লবণচাষি কল্যাণ পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন বলেন, একজন চাষি সাধারণত তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করেন। এতে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়। স্বাভাবিক মৌসুমে ওই জমিতে প্রায় ৬০০ মণ লবণ উৎপাদন হয়। বর্তমান বাজারদরে সেই লবণ বিক্রি করে খরচের তুলনায় খুব বেশি লাভ থাকে না। এ অবস্থায় আমদানি করা হলে প্রান্তিক চাষিরা আগামী মৌসুমে মাঠে নামতে আগ্রহ হারাবেন।
কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী খোকন মিয়া বলেন, মাঠে এখনো পর্যাপ্ত লবণ মজুত আছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চাষিরা এতদিন অনেক লবণ বিক্রি করতে পারেননি। চলতি মাসের শেষ দিকে এসব লবণ বাজারে আসতে শুরু করবে। এর মধ্যেই আমদানি করা হলে স্থানীয় লবণের দাম কমে যেতে পারে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
মহেশখালীর ধলঘাটার চাষি ফরিদুল আলম হতাশার সুরে বলেন, লবণ চাষ করা বড় কঠিন হয়ে পড়েছে। লাভের চেয়ের লোকসানের ঝুঁকি বেশি। লাভের মুখ সহজে দেখা যায় না বহুবছর। মোটামুটি চলে। কিন্তু লবণ আমদানি করা হলে তাও সম্ভব হবে না, চাষিরা না খেয়ে মরবেন।
বিসিকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে লবণের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। বর্তমান মজুত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে পারে। গত বছর মৌসুমের প্রথম দুই মাসে উৎপাদন খুব কম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সম্ভাব্য ২০ থেকে ২৫ দিনের সংকট মোকাবিলায় আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।
কক্সবাজার লবণ শিল্পের উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ–মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী মাঠে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়। বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় আড়াই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাই লবণ আমদানি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমদানি অনুমতি প্রদান সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র তিনি পাননি বলে জানান।













