পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামীতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের পথ খুলবে বলে জানিয়েছেন। গত ২৭ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বিষয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় এ কথা জানান তিনি। সংবাদ ব্রিফিংয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে চীন আমাদের বলেছে যে তারা বাংলাদেশ এবং মায়ানমার দুই পক্ষকে সাহায্য করবে, যাতে দ্রুততার সঙ্গে এই সমস্যাটা সমাধান হয়।’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনটি পক্ষ আছে, উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনটা পক্ষের একটা হচ্ছে মায়ানমার, আরেকটা এখন জায়গাটা যাদের অধীনে আছে আরাকান আর্মি এবং বাংলাদেশ। এ ছাড়া রোহিঙ্গা, যারা আমাদের দেশে আশ্রিত আছেন, তারাও একটা পক্ষ।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন, মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরাকান আর্মিপ্রধান–উভয় পক্ষই আমাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। আমি বেশি খোলাসা করে বলতে পারব না। সুতরাং আমাদের যোগাযোগ আছে। বর্তমান সরকার যে ধরনের জনসমর্থন নিয়ে এসেছে, যে শক্তিতে এসেছে; আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনগুলোতে আমরা এই সমস্যার সমাধানের একটা পথ দেখতে পাব। আপনারা মনে রাখবেন, আগে দুইবার কিন্তু বিএনপি সরকার রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করেছে। এটা সবাই জানে এবং আমরা যে সমাধান করব, এটাও সবাই জানে।’
এদিকে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া ভবিষ্যতেও আসিয়ানের বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই বলেছেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলাসহ অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে পুনরায় অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। গত ২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয়ে একমত হওয়ার কথা বলেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উভয় দেশ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সারা বিশ্ব অবগত যে, শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন তাদের নিরাপত্তা বিধান ও পরিচর্যার জন্য বিশাল ধরনের কর্মযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতি, সম্পদের স্বল্পতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ও পরিকাঠামোগত স্বল্পতা এবং একই সঙ্গে শরণার্থী মোকাবিলার প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উচ্চতম পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু সেক্টর চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চাপ মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যার সাড়া ইতিমধ্যে মিলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সুদূরপ্রসারী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, একই সময়ে ৯–১০ লাখ শরণার্থীর জন্য ত্রাণ এবং সুরক্ষা প্রদান করার গুরুদায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে। এই পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য প্রলম্বিত শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সে ক্ষেত্রে শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মানবিকতার সঙ্গে প্রয়োজন বিরাজমান বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করছি, তা নির্দিষ্ট করা এবং সরকারের উদ্যোগকে যথাযথভাবে প্রতিপূরণ (সাপ্লিমেন্ট) করতে পারে, এমন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যার শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এখনো এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি কেন যেন আলাপ–আলোচনা এবং অঙ্গীকারে একটি কাল্পনিক কথোপকথন ও প্রায় অকার্যকর অভিপ্রায়ে উপস্থাপিত হয়েছে এতোদিন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যা সমাধানে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরিতে অশুভ শক্তির প্রভাব বহুলাংশেই অনুভূত হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রভাবশালী দায়ী দেশসমূহ এ সংকট নিরসনে ন্যূনতম মনোযোগী ছিল না। ভূরাজনৈতিক অপকৌশল অবলম্বনে তাদের নানা রকম বাণিজ্যিক–রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে তারা শুধু তৎপরই ছিল। এখন নতুন করে সরকারি উদ্যোগে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে প্রতিবেশী ভ্রাতৃপ্রতিম দেশসমূহের ইতিবাচক দায়িত্বশীল ভূমিকা অগ্রগণ্য হওয়া উচিত। সংকট সমাধানে বুদ্ধিমত্তার সাথে বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।








