রাতুলের সাফল্য

আবুল কালাম বেলাল | বুধবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

অশত্থ গাছে ঘুঘু নাচে/ রাঙা বধূ নায়ে

আমি এখন নাচব মাগো/রুম ঝুমা ঝুম পায়ে।’ বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে রাতুল মায়ের দিকে তাকিয়ে ছন্দে ছন্দে আবদার করে।

: নাচতে ইচ্ছে করছে তোর? তো নাচবে। তার আগে ইশকুলের পড়াটা শেষ করো সোনা জাদু। নাচতে গেলে পড়াটা হবে না। আদুরে কণ্ঠ মা’র।

: না, আমি এখনই নাচবো।

: তুমি এখনই নাচবে? জেদ করো না সোনা।

: না, আমি এখনই নাচবো।

: ঠিক আছে। নাচো। দেখি কত নাচতে পারো?

রাতুলের সে কি খুশি! সে লাফিয়ে ওঠে। ঝট করে বই বন্ধ করে চেয়ার ছাড়ে। ফ্লোরে নেমে এসে দাঁড়ায়।

: মা, মোবাইলটার প্লে বাটনে টিপ দাও।

বাটন টিপতেই গান বাজতে থাকে : ‘খুকু নাচে রুম ঝুম রুম ঝুম পায়ে দিয়ে মল/ খোকা হাসে ফিক ফিক ফিক ফিক দেখবে কি চল্‌।’

: এ গানে নাচ করা যায়? নাচের গান বাজাও।

তা তা থৈ থৈ….’ ‘তা তা থৈ থৈ….’। রাতুল প্রথমে হাত দুটো প্রসারিত করে। আঙুলে নাচের মুদ্রা তোলে। পা দুটোকে নাড়াচাড়া করে। লাফায় ঝাপায়, কোমর দোলায়। এভাবে বার কয়েক দুলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে হাঁফিয়ে ওঠে। কপালে চিক চিক করছে নোনাজল। পা দুটোতে টনটনে ব্যথা। কেমন যেন ঝিমঝিম করছে মাথাটাও। না আর পারছি না। ‘না মা, নাচব না আমি আর।/লাগছে মাথা ভার ভার।’

ক্লান্ত শ্রান্ত রাতুল। পিপাসায় কাতর। টেবিলে রাখা জগ থেকে ঢক ঢক করে পানিতে তেষ্টা মেটানোর চেষ্টা। মা আড় চোখে খোকার অবস্থা দেখে যাচ্ছিল। মুখ টিপে হাসল আর মনে মনে বলল : ‘খোকা, নাচ অত সোজা না। বই পড়ার চেয়ে ভারি কম নয়। অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়।’

ক্লান্ত রাতুল একটু জিরিয়ে মাকে বলে– ‘নাচ নয় এবার মা/আমি এখন গাইব গানা।/স্বপ্নজগৎ আসবে ঘুরে/শুনলে গানা মিষ্টি সুরে।’

গান! চমকে ওঠে মা। : তোর যে বাজখাই গলা তাতে কি গান গাইতে পারবি?

: কেন পারবো না? পারবো। আমার মতো অনেকেই তো গান করে। রবিন, টুকলো, বাবুরা ইশকুলের ফাংশনে গান গেয়ে পুরস্কারটুরস্কারও পেয়েছে।

: দেখো চেষ্টা করে গাইতে পারো কিনা। পারলে খুব খুশি হবো আমি।মা উৎসাহ দেয়।

মা খেয়াল করে দেখে, ইদানিং রাতুল ছন্দে ছন্দে কথা বলার চেষ্টা করছে। বংশের প্রতিভা কিনা জানে না, তার দাদা ছিলেন কবি। হয়তো বা তাই ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রের মুখে এত পঙক্তিমালা!

রাতুল একটু স্বাভাবিক হয়ে হাত মুখধুয়ে গানে কণ্ঠ সাধার চেষ্টা চালায়। সারেগামাপাধাওমা কী কাণ্ড! সুর যে কণ্ঠ থেকে বেরুতেই চায় না! গলাটা কেমন যেমন ধরে ধরে যাচ্ছে। শুকনো ভাত আটকানো গলার মতো। শ্বাসটাও ধরে রাখা যাচ্ছে না। কী আর করা। অগত্যা রণে ভঙ্গ দিয়ে পড়ার টেবিলে। মুখ নিচু করে বসে থাকে রাতুল। রা শব্দ নেই। নিশ্চুপ। পরাজিত সৈনিকের মতো লাগছে তাকে। মা তার বেদিশা হাল দেখে উঠে আসে পড়ার টেবিলে। মাথায় হাত বুলিয়ে শাড়ির আঁচলে মুখের ঘাম মুছে দেয়। আঙুল দিয়ে মাথায় চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন, বাবা রাতুল, পৃথিবীতে সব কাজই সহজে করা যায়। আবার করা যায়ও না। সফলভাবে কোন কাজ শেষ করতে চাইলে তার জন্য প্রস্তুতি দরকার। আদাজল খেয়ে লেগে থাকতে হয়। একই সাথে প্রবল ইচ্ছেশক্তি আর গভীর সাধনায় ডুবে যেতে হয়। চেষ্টা বিনে কোন কাজ হাতের মুঠোয় ধরা দেয় না। আলোর মুখও দেখতে পাওয়া যায় না। তাই, তুমিও যা করতে চাও তা প্রস্তুতি নিয়েই করো। ইচ্ছে অটল থেকে বার বার চেষ্টা করে যাও। সাফল্যের জন্যে অনেক সাধনা দরকার। অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়। সেটা হোক পড়ার বেলায়, নাচের বেলায় কিংবা গানের ক্ষেত্রে। যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন সবক্ষেত্রেই কঠোর মনোযোগ, অধ্যাবসায় আর সাধনার প্রয়োজন। তবেই তুমি তাতে সফলতা অর্জন করতে পারবে। সার্থক হতে পারবে।

রাতুল ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করে। তার মনে পড়ে যায় শাকিল স্যারের কথা। বাংলার ক্লাসে বলেছিলেন, “চেষ্টা ছাড়া কেউ জীবনে সাফল্য পায় না। মনে রেখো ‘প্রাকটিস মেকস এ ম্যান পারফেক্ট’। তবে অবস্থা বুঝে চেষ্টাটা করতে হয়। যার পা নেই সে শত চেষ্টা করলে যেমন মেসি বা ম্যারাডোনা হতে পারবে না। তেমনি আবিষ্কারের নেশা না থাকলে, মননশক্তিভাববিষয় না থাকলে বিজ্ঞানী, লেখক, ডাক্তার কিছুই হওয়া যায় না। তাই অবস্থা বুঝে সেভাবেই তোমাদের চেষ্টা করতে হবে।”

রাতুল কথা না বাড়িয়ে পড়ায় মন লাগায়। আর মনে মনে শপথ করে, আজ থেকে সে যা মন করতে চায় তা গুছিয়ে ও প্রস্তুতি নিয়ে করবে। পড়ালেখায় মনোযোগী হবে আরও। যেই ভাবা সেই কাজ। পাশাপাশি চলতে থাকল শখের কাব্যচর্চা।

বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। আজ রাতুলের খুশির দিন। ফলাফল দেখে মা বলেন, ‘দেখলে তো চেষ্টার ফল কেমন। অদম্য সাধনা ছিল বলেই সবার উপরে তোমার স্থান। এ অর্জন ধরে রেখেই এগিয়ে যাও সোনা।’ কেবল মা নয়, পরীক্ষার ফল আর স্কুলের বার্ষিক দেয়ালিকায় কবিতা পড়ে রাতুলকে প্রশংসায় ভাসালেন শিক্ষকরাও।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোয়ান্টাম তত্ত্ব বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞানের নীরব বিপ্লব
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় মাদকসেবীর ২ মাসের কারাদণ্ড