মাইজভান্ডারী গান, শতবর্ষের আলোকে

নাসির উদ্দিন হায়দার | শুক্রবার , ২৪ জুলাই, ২০২৬ at ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

(প্রথম পর্ব)

আজ থেকে প্রায় ৯৪ বছর আগে ১৯৩২ সালে পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের সরাইপাড়ার সন্তান, শিল্পী মোহাম্মদ নাসিরের কণ্ঠে মাইজভাণ্ডারী গানের বিশ্বায়ন শুরু হয়। কলকতার বিখ্যাত এইচএমভি থেকে কালজয়ী সংগীতজ্ঞ জগন্ময় মিত্রের তত্ত্বাবধানে বের হয়েছিল নাসিরের প্রথম মাইজভাণ্ডারী গানের গ্রামোফোন রেকর্ড। সেই রেকর্ডের দুই পিঠে ছিল দুটি গান :

রসিক ভাণ্ডারী তোরে চিনব কেমনে

রসিক বিনে অরসিকে জানবে কেমনে॥

বাঁশী বাজে হৃদমন্দিরে কে বাঁশী ফুঁকে

এক বাজাবে গাউচুল আজম আর বাজাবে কে॥

ফটিকছড়ি মোকামের মহান সুফীসাধক হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (১৮২৬১৯০৬) প্রবর্তিত মাইজভাণ্ডারী তরিকার সাধনমার্গের অনুপম অনুষঙ্গ হিসাবে মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব। শতবর্ষের পথপরিক্রমায় মাইজভাণ্ডারী গান সাধনমার্গের সীমাবদ্ধ গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়েছে, বাংলা লোকসংগীতে এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব ধারা সৃষ্টি করেছে এই গান। (গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে, . সেলিম জাহাঙ্গীর’)

সুফিসাধক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ () সৃজিত মাইজভাণ্ডারী তরিকা আজ বিশ্বময় সমাদৃত। মাইজভাণ্ডারী দর্শনের সার কথা হলো মানবতাবাদ, ধর্মসাম্য ও ঐশীপ্রেম। আর মাইজভাণ্ডারী গান হলো মাইজভাণ্ডারী দর্শনের গভীরতম অনুষঙ্গ। বাহারুল উলুম সৈয়দ আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরীর হাতে মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব। মাইজভাণ্ডার নামক একটি গ্রাম থেকে একটি সংগীত ধারা সৃষ্টি হওয়া, তা বিশ্বময় ছড়িয়ে যাওয়া অসামান্য ব্যাপার। মাইজভাণ্ডারী গানের লোকসংগীতে রূপান্তর বা বিশ্বসভায় মর্যাদার আসন লাভ বিংশ শতাব্দীর এক বিস্ময়কর ঘটনা।

প্রথমেই মাইজভাণ্ডারী গানের তিনজন দিকপাল রচয়িতা মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, কবিয়াল রমেশ শীল ও আবদুল গফুর হালীর স্মরণ নেব। তাঁরা তিনজন তিন কালের মহান পদকর্তা। মওলানা হাদীকে মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভাবক বলা হয়, হাদীর সংগীত রচনার সময়কাল হলো ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ। কবিয়াল রমেশ শীল মরমী ধারায় মাইজভাণ্ডারী গানের সংযোজক, তার সময়কাল বিংশ শতাব্দীর বিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত। আর আবদুল গফুর হালী হলেন মাইজভাণ্ডারী গানে নবযুগের স্রষ্টা, ষাটের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত টানা ৬০ বছর মাইজভাণ্ডারী গানে মজে ছিলেন গফুর হালী।

আহ রে মনধন (আমার) লুটিয়ে নিল মনমোহিনী।

কুঞ্জবনে পুস্পাসনে নাচিল কামিনী॥

কপালে তিলকের ফোঁটা, সিঁথি পাত হীরা কাঁটা,

হাতে লিয়ে ফুলের জটা, নাচিল চন্দ্রাননী॥

(মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, রত্নভাণ্ডারদ্বিতীয় খণ্ড)

উপরিউক্ত গানের রচয়িতা হলেন মাওলানা হাদী। হাদীকে নিয়ে উনার গুরু গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী কালাম করেছিলেন, ‘আমার হাদীকে আমার আগেই যেতে হবে।’ গুরুর নির্দেশ মেনে মাওলানা হাদী গুরুর মহাপ্রয়াণের একবছর আগেই ১৯০৫ সালে পর্দা করেছেন।

হাদীর উপরিউক্ত গানে ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রেমিক কবি মুর্শিদ তথা প্রেমাস্পদের যে নান্দনিক রূপ বর্ণনা করেছেন তা তুলনাহীন। এই গানকে তুলনা করা যায় মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্য বৈষ্ণব পদাবলীর সাথে, বৈষ্ণব কবির মতোই মওলানা হাদী তাঁর কল্পনাকে চমৎকার অলঙ্কার পরিয়ে দেন।

মওলানা হাদীর উপরিউক্ত গানের প্রায় তিন দশক পর রচিত কবিয়াল রমেশ শীলের কালজয়ী মাইজভাণ্ডারী গানটি হলো :

চলরে মন ত্বরাই যাই, বিলম্বের আর সময় নাই,

গাওচুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুলেছে॥

আবাল বৃদ্ধ নরনারী, করে সবে হুরাহুরি,

নাম করে রেজিস্ট্রারী ভত্তি হতেছে॥

(কবিয়াল রমেশ শীল, জীবন সাথী)

রমেশ শীল মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে গিয়েছিলেন ১৯২৩ সালে, তিনি হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারীর ছোহবত পেয়েছিলেন। রমেশ শীলের ভাষায়, মাইজভাণ্ডার তাঁর ভাবের ঘরে আগুন দিয়েছিল। উপরিউক্ত গানটির সম্ভাব্য রচনাকাল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক। এই গানের ভাষা অনেকটাই গণমুখী, সুরও প্রচলিত ধারার। আসলে রমেশ শীলের হাত ধরেই মাইজভাণ্ডারী গান সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

এবার মাইজভাণ্ডারী গানের নবযুগের স্রষ্টা আবদুল গফুর হালীর গান :

দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতেছে নুরের খেলা

নুরী মাওলা বসাইল প্রেমের মেলা॥

আল্লাহু আল্লাহু রবে নানান বাদ্য শোনা যায়

গাউছুল আজম শব্দ শুনে আশেকগণে হুঁশ হারায়

জিকিরেতে আকাশ বাতাস করে আল্লাহু আল্লাহ॥

(আবদুল গফুর হালীর গীতিকাব্য ‘সুরের বন্ধন’, সুফী মিজান ফাউন্ডেশন)

গফুর হালী একজন সাধকশিল্পী। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মাইজভাণ্ডার দরবারে গিয়ে ঐশীপ্রেমে নিজেকে উজাড় করে দেন। হালীর ভাষ্য, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গমনের পর তার মধ্যে ভর করে অলৌকিক আনন্দের ভার, কে যেন বলতে থাকে, ‘লেখ, লেখ’। গফুর হালী গান বাঁধলেন-‘আর কতকাল খেলবি খেলা/মরণ কি তোর হবে না/আইল কত গেল কত/কোথায় তাদের ঠিকানা।’ (জ্ঞানজ্যোতি, আবদুল গফুর হালী)

গফুর হালীর মাইজভাণ্ডারী গানের সংখ্যা সহস্রাধিক।

আসলে, মাইজভাণ্ডারী দর্শন সুফী সভ্যতা বা নৈতিক মানবধর্মের আদর্শ দ্বারা মহিমান্বিত। ফলে মাইজভাণ্ডারী গান জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মন জয় করেছে সহজেই। সাধনমার্গ থেকে মাইজভাণ্ডারী গানের লোকসংগীতে রূপান্তরে মাইজভাণ্ডারী গানের দিকপাল নজরুল ইসলাম সাধকপুরী, শিল্পী ফিরোজ সাঁই ও কল্যাণী ঘোষের অবদান অবিস্মরণীয়। ফিরোজ সাঁইয়ের কণ্ঠে রমেশ শীলের ‘গাওচুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুলেছে’, কল্যাণী ঘোষের কণ্ঠে গফুর হালীর ‘দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে’ এবং বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে নজরুল ইসলাম সাধকপুরীর ‘গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী আয়নার কারিগর’ গানগুলো কালজয়ী গানে পরিণত হয়েছে। মাইজভাণ্ডারী গানের বিশ্বায়নে এসব গানের ভূমিকা অসাধারণ। এ ক্ষেত্রে এম এন আখতার রচিত গ্রামোফোন রেকর্ডে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘আমি ঐ গাউসিয়া একটি নামের দিওয়ানা’ গানটিও স্মরণীয়।

মাইজভাণ্ডারী গান মূলত মারফতি ও মুর্শিদী ঘরানার। লোকসংগীতের এই দুই ঘরানার গান সৃষ্টিকর্তাকে উপলক্ষ করে রচিত হলেও মাইজভাণ্ডারী গানে স্রষ্টার বদলে পীরের মাহাত্মই মুখ্য (চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখাআবদুল হক চৌধুরী)

দিল্লী ও আজমীরে খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া ও খাজা মঈনউদ্দীন চিশতীর দরবারের ধর্মীয় সংগীত ধারার সাথেও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় মাইজভাণ্ডারী গানের। বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, “মাইজভাণ্ডারের দরগাহে ‘হালকা’ ও ‘সিমা’ প্রায় সবসময়, বিশেষত বার্ষিক মেলার (উরস) সময় সমারোহ সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। এ দুটি অনুষ্ঠান এখন এখানকার ‘মস্তানদের’ (প্রমত্তদের) একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘হালকা’ বা বৃত্তাকারনর্তন মৌলানা রূমী প্রবর্তিত ‘মৌলবি’ সমপ্রদায়ের বৈশিষ্ট্য আর ‘সিমা’ বা সংগীতসাহায্যে মহিমা কীর্তন চিশতীয়া খান্দানের বৈশিষ্ট্য।”

(প্রবন্ধ : মাইজভাণ্ডারের মৌলানা শাহ্‌ আহমদুল্লাহ্‌ ও তার সাধনার সংক্ষিপ্ত পরিচয়, সম্পাদক সৈয়দ সহিদুল হক)

অন্যদিকে, চর্যাগীতিকা, বৈষ্ণব পদাবলী ও বাউল সংগীত ধারার সাথেও মাইজভাণ্ডারী গানের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। একক কোনো পদকর্তার নয়, অনেক গীতিকারের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ উপরিউক্ত তিন সংগীতধারা। যেমন চর্যাগীতিকায় কাহ্নপা, লুইপা, বৈষ্ণব পদাবলীতে চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস এবং বাউল সংগীতে লালন, পাঞ্জুশাহ, দুদ্দুশাহ হলেন উল্লেখযোগ্য পদকর্তা। তেমনি মাইজভাণ্ডারী গানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য গীতিকার হলেন, মওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মওলানা আবদুল গণি কাঞ্চনপুরী, মাওলানা বজলুল করিম মান্দকীনি, আবদুল্লাহ বাঞ্চারামপুরী, মনমোহন দত্ত, রমেশ শীল, খায়েরজ্জামা পণ্ডিত, মোহাম্মদ নাসির, আবদুল গফুর হালী, এম এন আখতার ও নজরুল ইসলাম সাধকপুরীসহ অনেকের মিলিত সৃষ্টিতেই সমৃদ্ধ মাইজভাণ্ডারী গান।

(সূত্রগাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী, শতবর্ষের আলোকে. সেলিম জাহাঙ্গীর)(আগামী পর্বে শেষ হবে)

পূর্ববর্তী নিবন্ধকিম্পুরুষ পাঠ অনুভূতি
পরবর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে বাসে ৪৭ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার একজন