মা-বাবারা রামিসাদের কোথায় লুকাবে ?

কাজী রুনু বিলকিস | শনিবার , ২৩ মে, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক একটা পরিবর্তন এসেছে। অপমানঅসম্মান এমনকী নৃশংসতা ও খুনাখুনিকেও খুব স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আমরা নিষ্ঠুরতাকে উসকে দিয়ে মজা পাচ্ছি, উপভোগ করছি! ভিন্ন মতের মানুষকে পিটিয়ে মারার ন্যায্যতাও পাওয়া যাচ্ছে কখনো কখনো। অপরাধকে অপরাধ মনে না করার এই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার উপায় কি? সোশ্যাল মিডিয়া কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার হয়ে উঠেছে! হা হা রিএক্টের প্রতিক্রিয়ার সহিংসতায় পড়ে একজন নারীর প্রাণ গেলো। ছেলেকে বাঁচাতেই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। নারীদের প্রতি একসময় একধরনের সহানুভূতি কাজ করতো। এখন সেটাও আর অবশিষ্ট নেই! তুচ্ছ ঘটনা আর তুচ্ছ থাকে না। জমা হয় ঘৃণা, জমা হয় রাজনীতি, জমা হয় বিভাজন, জমা হয় প্রতিশোধ। হিংসা বিদ্বেষের উদ্‌গীরণে হয়ে উঠে রণক্ষেত্র! ই ঘৃণা আর বিভাজনের কারণে ধসে পড়েছে সমাজের মানবিক দেওয়াল। সময় আমাদের এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যেখানে আমাদের মানবিক বোধগুলো আর কাজ করছে না। সোশ্যাল মিডিয়া এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভূমিকায় অবতীর্ণ। কারো মৃত্যুতে উল্লাস করছি। কাউকে চিনি না, জানি না কিন্তু পডকাস্টে এসে এমন সব মন্তব্য করছি যাতে সমস্ত সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে! কারো দুঃখ কষ্ট আমাদের ব্যথিত করছে না!

এই লেখা লিখতে বসে সামনে আরও একটা দুঃসহ খবর সামনে আসলোঢাকার পল্লবীতে রামিসা নামক সাত বছরের একজন স্কুল ছাত্রীর খাটের নীচে দেহ, বাথরুমে খণ্ডিত মাথা! মা খুঁজতে গিয়ে পাশের বাসায় এই অবস্থায় পায়! শিশুটাকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এটাই এখন আমাদের বাংলাদেশ! হামে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে শিশুর জীবন। অসহায় মাবাবার আর্তনাদ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। এ পর্যন্ত চার থেকে পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অব্যবস্থাপনা ও সময়মতো টিকা সংগ্রহ না করে এই শিশু মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী তারা কত সহজে দায়মুক্তি নিচ্ছেন কত সহজ যুক্তিতে! এদেশে জীবনই বা কি, মৃত্যুই বা কি! মরছে তো সব গরীবের সন্তান! সামর্থ্যবানদের জন্য মাঠ গরম হয়, রাস্তা গরম হয় সোশ্যাল মিডিয়া ফেটে পড়ে, রাস্তা রুদ্ধ হয়। আর অক্সিজেনের পাইপ খুঁজতে যাওয়া দরিদ্র পিতাকে শুধু ডেকে বলা হয়, তোমার সন্তান মারা গেছে, নিয়ে যাও! আহা জীবন!

সেদিন পত্রিকায় দেখলাম, এক দম্পতি বিয়ের এগারো বছর পর অনেক চিকিৎসা নিয়ে তাদের কোল আলো করে একটা ছেলে সন্তান এসেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে তাদের সেই সন্তানটিকেও হারাতে হলো! এই কষ্ট, এই বেদনার ভার কোথায় রাখবে ওরা! হামের এই মহামারী এর আগে কি আমরা দেখেছি? মানুষের স্বপ্ন ভাঙ্গে, হৃদয় ভাঙ্গে,ঘর ভাঙ্গে! আমরা ক্রমশ পঙ্কিল রাজনীতিতে ডুবে যাচ্ছি। আমাদের কোনো পথের সন্ধান নেই। দূরাগত কোন আলোর নিশানা নেই। নতুন প্রজন্ম যারা সবসময় আশা ও স্বপ্নের জায়গা। তারাও কি আমাদের হতাশ করেনি? তাদের আত্মপ্রেম কি দেশপ্রেমকে ছাড়িয়ে যেতে দেখিনি? আমরা কি দেখেছি হাম আক্রান্ত শিশুদের পাশে তাদের দাঁড়াতে? সোশ্যাল মিডিয়ায় ভর করে বেড়ে উঠা জেনারেশন যেরকম হওয়ার কথা তারা সেইরকমই হয়েছে। মন ও মগজে তারা তাদের নিজেদের জন্য।

উখিয়ার নিহত মহিলা নিজের সন্তানকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন, তাকে মা বলে, নারী বলে কোন ছাড় দেওয়া হয়নি! সহিংসতা থেকে সরানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি! তাকেও আঘাত করা হয়েছে সেই আঘাতে তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।

সামপ্রতিক সময়ে নারীর উপর আক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ইন্টরীম সরকারের আমলে চালু হওয়া মব থামেনি! বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তার বিষয়ে একটা শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার কথা উল্লেখ করা আছে। তিন মাস হয়তো খুব বেশি সময় নয়। তবুও সকালের সূর্য কি বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে আর ভুক্তভোগীদের আড়াল করে দেয়। সার্বিক পরিস্থিতির কথা বাদ দিয়ে শুধু নারী ও শিশুর প্রতি যে ফৌজদারী অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে তারও কি কোন প্রতিকার দেখেছি? আরও একটা গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হচ্ছে সমাজের মূলে রয়ে যাওয়া পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভ ও দাপট। এটা নিরাময়ের কি ব্যবস্থা আছে তা আমার জানা নেই। আমরা সবসময় রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিচারিতা দেখতে অভ্যস্ত। যখন নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের নৈরাজ্যমূলক আচরণকে লেজিটিমেট দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তখন সাধারণ মানুষের কাছে একটা বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছায়। জানি না উখিয়ার সেই নারী হত্যার বিচার আদৌও হবে কিনা। সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হচ্ছে শিশুদের নিরাপত্তা। যে হারে শিশুরা নৃশংসতার শিকার হচ্ছে তাতে রাষ্ট্র নামক কোনো ব্যবস্থার মধ্যে আছি বলে মনে হয় না। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে প্রতি বছর শতশত শিশু হত্যার শিকার হচ্ছে যার মধ্যে বড় একটা অংশ শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার। শিশুরা কোথায় নিরাপদ? বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা। মাবাবারা রামিসাদের কোথায় লুকাবে? মায়ের গর্ভ আর কবর ছাড়া তো কোথায়ও তারা নিরাপদ নয়! এই দেশ কবে, কখন নারী ও শিশুদের জন্য একটা নিরাপদ বাসযোগ্য রাষ্ট্র হয়ে উঠবে?

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅসহায় শৈশব, মহামারি আর পাশবিকতার যাঁতাকলে সমাজ কি তবে পচে গেছে?
পরবর্তী নিবন্ধমাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল