মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধরাশায়ী ট্রাম্প

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা

| বৃহস্পতিবার , ৫ নভেম্বর, ২০২৬ at ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি মানুষের গতকাল ঘুম ভাঙল বদলে যাওয়া এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়। গোটা দেশে ঝড় তুলে মার্কিন কংগ্রেসের দখল নিল ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার বাছাই করা প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান, আরও সঠিক ভাবে বললে ধরাশায়ী করল মার্কিন ভোটাররা। এখন কংগ্রেসের দুই কক্ষ–প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো টেক্সাস ও কানসাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজ্যগুলোতেও আসন ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি সময়ে তাদের হাতে থাকবে দেশটির আইনসভার নিয়ন্ত্রণ।

এতদিন দেশটির আইনসভা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির হাতে। কংগ্রেসই সারা দেশে আইন তৈরি ও পাস করে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে মোট আসন ১০০টি। নির্বাচনের আগে সেখানে ৫৩–৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল রিপাবলিকানরা। অর্থাৎ, তাদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের হাতে ৪৭টি। এ বারের নির্বাচনে ৩৫টি সেনেট আসনে ভোট হয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেখানে তারা সাতটি আসন বাড়িয়েছে। অর্থাৎ এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন ৫৪টি। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ৫১টি আসন প্রয়োজন।

সিনেটের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও বড় জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। এই কক্ষে মোট আসন ৪৩৫টি। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ছিল ২১৪। দুটি আসন ফাঁকা ছিল। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ২১৮টি আসন প্রয়োজন। এবার ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২৩১টি এবং রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৯টি।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই চার বছর অন্তর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টির মধ্যে ৩৫টি এবং নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের ৪৩৫টি সাধারণ আসনের সব ক’টিতেই ভোটগ্রহণ হয়। সেই সঙ্গে ভোটগ্রহণ হয়েছে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের ‘ভোটদানের ক্ষমতাহীন’ ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি এবং ৩৬টি প্রদেশ (স্টেট) আর ৩টি টেরিটরির গভর্নর পদে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস বলছে গত এক শতাব্দীর মধ্যে মাত্র তিন বার ক্ষমতাসীন দল জয়ী হয়েছে– ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ১৯৩৪ সালে। বিল ক্লিন্টনের জমানায় ১৯৯৮ সালে এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট পর্বে ২০০২ সালে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে হেরে গেলেও সিনেটে একটি আসন বেড়েছিল রিপাবলিকানদের।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার পর্বে দেশবাসীকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ব্যালট পেপারে আমার নাম রয়েছে, এটা ধরে নিয়ে ভোট দিন’। তার উত্তরে এমন সব জায়গায় তার প্রার্থীরা হেরেছেন, যেগুলি দশকের পর দশক ধরে রিপাবলিকানদের গড়। যেমন, কানসাস। ১৯৩০ দশকের পরে এই প্রথম সে রাজ্যের সেনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেল। টেঙাসেও ১৯৮৮ সালের পরে সেনেটে হারল রিপাবলিকানেরা। শুধু তা–ই নয়, টেঙাসের গভর্নর পদও ডেমোক্র্যাটদের দখলে গিয়েছে। তিন বারের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন জিনা হিনোজোসা। ট্রাম্প জমানায় লাতিন আমেরিকার দেশগুলি থেকে আসা মানুষজন এবং গ্রামীণ জনতার মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রভাব বেড়েছিল। এক রাতে সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের এই ভূমিধস জয়ের পর রিপাবলিকান দলের ভেতরে কী ধরনের চিন্তাভাবনা চলছে, দলটির একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট বা কৌশলবিদের কাছে এই প্রশ্ন করেছিল বিবিসি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ট্রাম্প–ভ্যান্স ট্রানজিশন টিমে কাজ করা রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্ট মার্ক বেডনার জানান, এটা স্পষ্ট যে তাদের দল ‘২০২৪ সালে ঐতিহাসিক জয় এনে দেওয়া ট্রাম্পের সেই ভোটার জোটকে এবার উজ্জীবিত করতে পারেনি।’ তিনি বলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা তাদের সিংহভাগ শক্তি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত পরিচালনা করতে ব্যয় করবে। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের চেষ্টাও করবে। তাদের নিজেদের দলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে, যা সামনে আরো বাড়বে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘রিপাবলিকানদের এখন এই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে যে, একাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানার মূল চালিকাশক্তি হতে পারেন না।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধযুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হলেন আবদুল আল-সায়েদ
পরবর্তী নিবন্ধআড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন, কমেছে দেনার পরিমাণ