ন্যূনতম মজুরিসহ বিভিন্ন দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়া এবং গাজীপুর শিল্পাঞ্চল অশান্ত হয়ে ওঠেছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যে গতকাল রোববার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে এসে অবরোধ তৈরি করেন। এ সময় ঢাকার মিরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর, লাঠিপেটা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় একদিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের ফলে ঢাকা–টাঙ্গাইল ও ঢাকা–আরিচা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এতে এই দুই পথে যাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। অসন্তোষের মধ্যে মিরপুরে ২৯ জন এবং গাজীপুরে ২০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। বিজিএমইএ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ সোমবার থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন মালিকরা। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
শিল্প পুলিশ–২ গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা–টাঙ্গাইল এবং ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের স্থানে স্থানে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাজীপুরের কোনাবাড়ি, শফিপুর, পল্লীবিদ্যুৎসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকরা সকাল থেকে রাস্তায় ছিল। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক–পুলিশ দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। দুপুরের দিকে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় এসব এলাকা। উত্তেজিত শ্রমিকরা আগুন দিয়েছে পুলিশ বঙে, ভাঙচুর করা হয়েছে কয়েকটি গাড়িও। ফলে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
পুলিশ জানায়, আন্দোলনের একপর্যায়ে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বঙে আগুন দেওয়া হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পরিবহন চালকরা। পরে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার সেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিকরা বিকাল ৩টার দিকে মহাসড়ক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর যানবাহন চলাচল শুরু হয়। আশপাশের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক আছে। পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া বিকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক মিলে ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন। এ কারণে ওই পথে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুর ১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়, যা চলে প্রায় দুপুর ২টা পর্যন্ত। এ সময় মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দুপুরের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মিরপুর ১০, মিরপুর ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সড়ক ও রেল দুই পথেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে গতকাল সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। পরে দুপুর ১টার দিকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
সাভার–আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৩০০ কারখানায় ছুটি : ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ অন্যান্য দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এছাড়া গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্প পুলিশ–১ এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া গতকাল বিকালে বলেন, সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি তৈরি পোশক কারাখানা আজকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বিকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক মিলে ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন। এ কারণে ওই পথে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। পুলিশ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে।
শিল্প পুলিশ–২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, সারা দিনে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ থেকে কারখানা বন্ধ : পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ সোমবার থেকে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন মালিকরা। গতকাল সন্ধ্যায় এ কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
দিনভর শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল প্রায় ৬০০ কারখানা বন্ধ ছিল।










