ভূজপুরে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার মহোৎসব

জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, হুমকির মুখে হালদার জীববৈচিত্র্য জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি

মোহাম্মদ জিপন উদ্দিন, ফটিকছড়ি | মঙ্গলবার , ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ

ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর ইউনিয়নে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ (মাটি) কাটা এবং টিলা কাটার মহোৎসব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো ইউনিয়ন জুড়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। এর ফলে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি উর্বরতা হারিয়ে জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূজপুরের সিংহরিয়া, মির্জারহাট নগরবাজারের দক্ষিণে হালদা নদী, এক্কুলিয়া, নলুয়া খাল, সিকদারপাড়া হালদা নদী, কোটবাড়িয়া নাজিরখিল, কইয়া বড় ব্রিজ সংলগ্ন হালদা নদী, পশ্চিম কইয়া গাছুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব দিকে টিলা ও কৃষি জমি এবং বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় রাতের অন্ধকারে ড্রেজার ও স্কেভেটর বসিয়ে অবাধে বালু ও মাটি কাটা হচ্ছে। প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। কৃষকরা জানিয়েছেন, কৃষি জমির ওপরের অতি গুরুত্বপূর্ণ উর্বর মাটি সাবাড় করে দেওয়ায় এসব জমি এখন অনাবাদি হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম(ফটিকছড়ি) আসনের বেসরকারিভাবে নির্বাচিত এমপি সরোয়ার আলমগীর কঠোর হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ফটিকছড়ির বনাঞ্চল, হালদা নদী ও কৃষি জমি রক্ষায় আমরা কোনো আপস করব না। যারা রাজনীতির নাম ভাঙিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমি প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি, অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমপি আরও যোগ করেন, ফটিকছড়িকে একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে এই ‘মাটিখেকো’ চক্রকে নির্মূল করা হবে।

এদিকে, অবৈধভাবে মাটি কাটার ফলে এলাকায় গভীর গর্ত বা ‘মৃত্যুফাঁদ’ তৈরি হচ্ছে। অতি সমপ্রতি ভূজপুর সংলগ্ন হারুয়ালছড়িতে এ ধরনের মাটি কাটার গর্তে জমে থাকা পানিতে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভারি ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে স্থানীয় গ্রাম্য রাস্তাঘাটগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও সরঞ্জাম জব্দ করলেও এই অবৈধ কারবার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, হালদা নদী ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। ইতোমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু জব্দ ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়াও মাটি কাটার কাজে জড়িত স্কেভেটর, ড্রাম ট্রাক জব্দ করে জরিমানা ও অনেককে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সিন্ডিকেটের মূল হোতারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় তারা বেশিরভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি পুরো ভূজপুর ইউনিয়ন ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধছোটপুল থেকে শীর্ষ ছিনতাইকারী শাফায়েত গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধচাকরির টাকা ফেরত চাওয়ায় তরুণকে ছুরিকাঘাত