বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৫২ এর এ আন্দোলনে মায়ের ভাষা বাংলার জন্য যারা জীবনবাজি রেখে চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রাম করেছিলেন তাঁদের অন্যতম মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী। ভাষা আন্দোলন সহ অসংখ্য আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রনায়ক আহমেদুর রহমান আজমী ১৯২৮ এর ২ নভেম্বর চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ইছাখালি ইউনিয়নের দেওখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সে সময়ের দারুল উলুমের ডিগ্রিধারী খ্যাতিমান আলেম গোলামুর রহমান, মাতা মরিয়মুন্নেসা। জন্মের পর বাড়ির পার্শ্ববর্তী সাহেবীনগর প্রাইমারী স্কুলে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে পিতার কর্মস্থল মিঠাছড়া ফয়েজ আল ইসলামীয়া সিনিয়র মাদ্রসায় ভর্তি হন।
১৯৪৮ সালে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা থেকে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। বাল্যকাল হতেই তাঁর মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন ঘটে। পিতার কাছে শোনেন ব্রিটিশ বিরোধী খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের গৌরবগাথা। আবুরহাট বাজার ছিল তাঁদের বাড়ির সন্নিকটে সেখানে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের নিয়মিত সভা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা কর্মীদের আনাগোনা ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র–পত্রিকা ডাকযোগে আসতো সংস্কৃতি ও শিক্ষা প্রসারে অগ্রসরমান আবুরহাটে ।
১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে আহমেদুর রহমানের ভূমিকা অসামান্য। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি এতই সচেতন ছিলেন যে, প্রতিদিন ক্লাস শেষে ট্রেনে চেপে শহরে চলে আসতেন এবং সভা–সমাবেশ সহ নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ শেষে রাতেই হাটহাজারী ফেরত যেতেন। আন্দোলনকালীন সময়ে তিনি ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র আটারো দিনের মাথায় অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। দুই সপ্তাহ পর তিনি ভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনামূলক পুস্তিকা প্রকাশ করেন।
১৯৪৭ এর নভেম্বরে চন্দনাইশের সোলায়মান খানকে আহ্বায়ক করে চট্টগ্রামে গঠিত হয় তমদ্দুল মজলিসের কমিটি। ১৯৪৭ এর নভেম্বর মাসে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী প্রকাশ করে ব্যতিক্রমধর্মী ও এক সাহসী সাহিত্য পত্রিকা ‘সীমান্ত’। আহমেদুর রহমান প্রগতিশীল ছাত্রদের সাথে এ পত্রিকায় যুক্ত হন। সে সময় রুহুল আমিন নিজামী কর্তৃক সম্পাদিত পত্রিকা ‘উদয়ন’ একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। ‘সীমান্ত’ এবং ‘উদয়ন’ দুটি পত্রিকাকে ঘিরেই চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতি পরিমণ্ডল গড়ে উঠে।
হাটহাজারীতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে আহমেদুর রহমান আজমী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। হাটহাজারী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহমেদুর রহমান আজমী আহ্বায়ক এবং হাটহাজারী স্কুলের ছাত্র শাহাবুদ্দীন হলেন সম্পাদক।
ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে কলকাতা হতে প্রকাশিত ‘সত্যযুগ’ কাগজে ঢাকার গুলির সংবাদ শুনে হাটহাজারীতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মিছিল মিটিং শুরু হয়। এ মিছিল মিটিং এবং জনসমাবেশে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন আহমেদুর রহমান আজমী।
ঢাকায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর চট্টগ্রামেও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আহমেদুর রহমান আজমী ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের সংবাদ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লে সংগ্রাম পরিষদ বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রকর্মী এবং সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেঠে পড়েন। ধর্মঘট পালিত হয়। দেওয়ালে পোস্টার ও প্রচারপত্র বিলি, হরতাল, পিকেটিং প্রভৃতি কাজে ভাষা সংগ্রামীদের সাথে মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী একজন নির্ভরযোগ্য কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন।
চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে চট্টগ্রামে মাত্র দু’টি প্রধান ঘাঁটি ছিল। একটি ‘সীমান্ত’কে অন্যটি ‘উদয়ন’। হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র হলেও আহমেদুর রহমান পুরোদমে মার্কসবাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। চট্টগ্রামে বামপন্থী ছাত্র ৩ অন্যদের নির্ভরযোগ্য ‘সীমান্ত’ ও ‘উদয়ন’ পত্রিকাকে ঘিরে চট্টগ্রামে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতির চর্চা গড়ে উঠে। এখানে জাতীয় প্রগতি, বিশ্বশান্তি, শিল্পী সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীলতাকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা বাংলা সাহিত্যের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে মূলধারায় নিয়ে যাওয়া সকল প্রকার বিকৃতি, কুসংস্কার, কূপমুণ্ডকতা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং সম্প্রদায় বিভেদের বিরুদ্ধে সবার উপরে মানুষ সত্য এ আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে সৃষ্টিশীল সাহিত্য চর্চাকে উৎসাহিত করাই ছিল এখানকার ছাত্র–যুবকদের মূল্য উদ্দেশ্য।
মাদ্রাসার ছাত্র মাওলানা আজমী এতোটাই নির্ভীক ছিলেন যে, তিনি প্রকাশ্যে প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালীন সময়ে বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন এর সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৭ এর আগস্ট থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সহ সমগ্র পূর্ব বাংলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীরা সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সে সময় চট্টগ্রাম ছাত্র ফেডারেশনের গোপন আড্ডা ছিল দেওয়ানজী পুকুরের পশ্চিমপাড়ের গোপাল সেন ওরফে কালাচাঁন বাবুর বাসা। মওলানা আজমী ও সে আড্ডার নিয়মিত সদস্য। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫২ এর ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম শহরের বাটালি রোডস্থ ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউট হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা ও নগর কমিটি গঠিত হয়। মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী ছাত্র ইউনিয়নের বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় এবং নির্বাচনের আগে গণতান্ত্রিক কর্মীশিবির গঠিত হয়। এ কর্মীশিবিরের আহ্বায়ক হন ওমর হায়াত এবং যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন মাওলানা আজমী। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে সমগ্র জেলার কর্মী শিবিরের কর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, মাওলানা আজমী বাঁশখালী আসনের প্রার্থী অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদের পক্ষে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। মওলানা আজমী পরবর্তীকালে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন ও জেলা শাখার অফিস সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে ঢাকার রুপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে তিনি চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ন্যাপ’ গঠিত হলে অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদকে সভাপতি ও মওলানা আহমেদুর রহমান আজমীকে ন্যাপের চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। সেই থেকে একটানা ৩৭ বছর ন্যাপের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকেন মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী।
১৯৭০ এর নির্বাচনে মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী মীরসরাই আসন থেকে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। তিনি ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭১ ্এর ২৯ মার্চ মওলানা আজমী ভারতের উদ্দেশ্যে ফেনী নদী অতিক্রমে করে ২৩ এপ্রিল আগরতলা পৌঁছেন। মনু বাজার অভ্যর্থনা ক্যাম্পের দায়িত্ব তাঁকে দেয়া হয়। এ ক্যাম্পে তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বখতেয়ার নুর সিদ্দিকী, আবু তাহের মাসুদ। ১৬ ডিসেম্বার ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে তিনি ২০ ডিসেম্বর সীমান্ত অতিক্রম করে এলাকায় চলে আসেন এবং দেশকে পূর্ণগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
মওলানা আহমেদুর রহমান আজমী জীবনের পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করেছেন। তিনি নিজে একজন ডিগ্রিধারী আলেম হয়েও আজীবন অসম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছেন। তিনি ২০১১ এর ১৭ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।











