একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেছেন, জগতের সবকিছুই তার সমস্ত গুণাবলী নিয়ে জন্মায়। বাঘ, সিংহ, বানর কিংবা শেয়ালশাবক বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজে নিজেই সব রপ্ত করে নেয়। শুধু মানুষকেই মানুষ হওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করতে হয়। আর এই চেষ্টার প্রথম ধাপই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় সম্পদ। ভালো মানুষ হতে পারাই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজারের পেকুয়ায় আলহাজ্ব মোহাম্মদ কবির চৌধুরী স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষার সনদ ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজাখালীর ফৈজুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো করলে হবে না, মানবিক গুণেও সমৃদ্ধ হতে হবে।
বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এম এ মালেক বলেন, তোমরাই আগামীর বাংলাদেশের নির্মাতা। তোমরা সোনার মানুষ হলে দেশটাকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে পারবে। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, আর আলোকিত মানুষই সমাজকে বদলে দেয়। তিনি বলেন, অন্ধকার দূর করতে যেমন আলোর প্রয়োজন, তেমনি মনের অন্ধকার দূর করতে জ্ঞানের প্রয়োজন। তাই বেশি বেশি করে পড়তে হবে, জানতে হবে। তা না হলে জ্ঞানের পরিধি বাড়বে না। জীবনে অনেক সমস্যা, বাধাবিপত্তি আসবে। তারপরও লেখাপড়া করতে হবে, নিজের সমস্ত শক্তি নিয়ে লেগে থাকতে হবে। তাহলেই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারবে। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে, তাহলেই সফলতা আসবে। নিজেকে গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো ছাত্রজীবন।
শিক্ষকদের প্রতি সম্মান একজন শিক্ষার্থীর চরিত্রকে সমৃদ্ধ করে উল্লেখ করে এম এ মালেক বলেন, জীবনে তিনজন মানুষ কোনোদিন তোমাদের অকল্যাণ কামনা করবেন না। একজন তোমার বাবা, একজন তোমার মা এবং একজন তোমার শিক্ষক। এই তিনজনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড, আদেশ–নির্দেশ সবই তোমাদের কল্যাণে। তাই জীবনে এই তিনজনের অবাধ্য হইও না।
ফৈজুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি এ জে এম গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন গভর্নিং বডির সহসভাপতি এটিএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির চৌধুরী, পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, রাজাখালী এয়ার আলি খান উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বিএসসি, শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জসিমউদ্দিন আহমেদ, ফৈজুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সালেহ আহমেদ, টইটং উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক দলিল আহমেদ, হুসনে আরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন, শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইব্রাহীম, রাজাখালী বিইউআই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কফিল উদ্দিন ফারুকী প্রমুখ।
আলহাজ্ব মোহাম্মদ কবির চৌধুরী রাজাখালী এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং এতিমখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সমাজে আলো ছড়িয়েছেন মন্তব্য করে দৈনিক আজাদী সম্পাদক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদেরকেও একেকজন কবির চৌধুরী হতে হবে। সমাজে আলো জ্বালাতে হবে। তিনি বলেন, জন্মের সময় তুমি একাই কেঁদেছিলে। জীবনটা এমনভাবে গড়তে হবে যেন মৃত্যুর সময় তোমার জন্য সবাই কাঁদে। মানুষের জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। ইম্পসিবলকে ভেঙে আই এম পসিবল ভাবতে হবে। সবসময় পজেটিভ চিন্তা করার জন্যও তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান। তরুণদের ইতিবাচক চিন্তাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সচ্চরিত্রবান ও ভালো মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তোমরা নিজেরা যদি ভালো হও, সচ্চরিত্রবান হও, তাহলে দেশ ভালো থাকবে, আমরা এগিয়ে যাব। তোমরা চরিত্রবান এবং সৎ হলেই কেবল তোমার প্রতিবেশী বা অন্যদের সৎ ও চরিত্রবান হওয়ার কথা বলতে পারবে।
নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, একটি কলম, একটি বই এবং একজন শিশু পৃথিবীকে পাল্টে দিতে পারে। তোমরা আমাদের পৃথিবী পাল্টে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠো। মেধা তখনই মূল্যবান হয়, যখন তা সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে লাগে।
বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু মন্তব্য করে এম এ মালেক বলেন, একটি ভালো বই একজন বন্ধুর মতো, একজন ভালো বন্ধু একটি পাঠাগারের মতো। তোমরা ভালো বন্ধু তৈরি করো। যে বন্ধু তোমাকে অসৎ হওয়া শেখাবে না, চরিত্র নষ্ট করবে না। ভালো বন্ধু পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার অনেক বড় নেয়ামত।
বক্তারা মরহুম আলহাজ্ব কবির চৌধুরীর স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, এলাকার মানুষের জন্য এমন দরদি মানুষ খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ষাটের দশকে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে না তুললে বহু মানুষ জীবনে শিক্ষার সুযোগ পেতেন না। এলাকার একটি পাড়ায় এগারোজন বিসিএস ক্যাডার তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, পাড়াটির নাম বিসিএস পাড়া হয়ে গেছে। এলাকার এই যে অর্জন এর পেছনে মরহুম কবির চৌধুরীর অনন্য ভূমিকা রয়েছে। কবির চৌধুরীর সন্তানেরাও পিতার মতো এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর জন্য, এলাকার নারীদের শিক্ষিত, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নানাভাবে কাজ করে চলেছেন। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সেলাই শেখার পর সেলাই মেশিন দিয়ে নারীকে স্বাবলম্বী করার নানা প্রকল্প এলাকায় চালু করা হয়েছে। কবির চৌধুরীর উত্তরাধিকারদের এসব কর্মকাণ্ড এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নসহ সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।













