ব্যবসায়ীর ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ

জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে সিম কার্ডের নিয়ন্ত্রণ

হাবীবুর রহমান | শনিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) কেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ভুয়া লিংক বা ফিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং এবং সিম কার্ডের বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মতো অভিনব অপরাধ এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে সিম কার্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হচ্ছে ট্রানজেকশন, এমনকি সরকারি বোয়েসেলের ভূয়া লিংকে অর্থ হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটছে, যার নেপথ্যে কাজ করছে একাধিক চক্র। এসব প্রতারকদের খপ্তরে পড়ে সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসায়ীরাও সর্বস্ব হারাচ্ছেন। থানাপুলিশের পাশাপাশি আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার বিবরণ বিশ্লেষণ করলে এই ধরনের জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে মোবাইল অপারেটরদের দায়িত্বহীনতা ও নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।

আদালত সূত্র জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন ফলমণ্ডি মার্কেটের ‘মা এন্টারপ্রাইজ’ এর স্বত্বাধিকারী মাইনুদ্দিন হাসান চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি নালিশী মামলা দায়ের করেন। মামলার আরজিতে বলা হয়, মাইনুদ্দিন হাসানকে জীবিত থাকা সত্ত্বেও ‘ডেথ কেস’ সাজিয়ে তার বায়োমেট্রিক রেজিস্টার্ড রবি সিমের মালিকানা বদলে ফেলা হয়েছে। দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজ জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে ব্যবহৃত এই সিমের (০১৮৪১৮৫৯৮১৮) মাধ্যমে তিনি বিকাশ ও নগদ এজেন্টের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। গত ২৭ আগস্ট নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে একটি এসএমএসের মাধ্যমে তার সিমের ‘ডেথ কেস রেজিস্ট্রেশন’ সম্পন্ন হওয়ার বার্তা আসে। পরবর্তীতে নিউমার্কেট রবি সেবা কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মৃত ব্যক্তির সিম হস্তান্তরের ভুয়া কাগজ দেখিয়ে সিমটি অন্য নামে নিবন্ধন করা হয়। এই মামলায় রবি আজিয়াটা পিএলসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও চিফ এঙিকিউটিভ অফিসারসহ সুনির্দিষ্টভাবে তিনজনকে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযুক্ত আসামিরা হলেন: মো. রায়হান মিয়া, রবি আজিয়াটা পিএলসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও চিফ এঙিকিউটিভ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জিয়ান শাহতারা ও রবি কাস্টমার কেয়ারের ইনচার্জ। মামলার আরজিতে বলা হয়, আসামিরা বাদীর নগদ ও বিকাশ এজেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবৈধভাবে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি ইট্রানজেকশন করেছেন এবং নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতিবাদ করলে ১নং আসামি নিজেকে ডিজেএফআই পরিচয় দিয়ে বাদীকে হুমকি দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ শেষে মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী শোয়েব আলী চৌধুরী। আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগপ্রার্থী তরুণ উদ্যোক্তা মো. শামীম মিয়াকে সরকারি সংস্থা ‘বোয়েসেল’এর ভুয়া লিংক পাঠিয়ে তার মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১২ আগস্টে সংঘটিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানা এলাকার এই ঘটনায় শামীম মিয়া বাদী হয়ে গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আরজি অনুযায়ী, বোয়েসেলের পোর্টালে প্রোফাইল থাকা শামীমকে একটি এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো লিংকে প্রবেশ করতে বলা হয়। সরল বিশ্বাসে লিংকে ক্লিক করার সাথে সাথেই তার মোবাইল ফোনটি হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে ১০টি ট্রানজ্যাকশনের মাধ্যমে ৮৫ হাজার ৭০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। আত্মসাৎকৃত এই অর্থ ‘জঙইও অঢওঅঞঅ চখঈজগ৬১৪৬৯’ হিসাবের মাধ্যমে ‘মাই এয়ারটেল’ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এই মামলায় রবি আজিয়াটা পিএলসি এবং মাই এয়ারটেল অ্যাপস কর্তৃপক্ষকে ২ নম্বর আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রবি আজিয়াটার কিছু কর্মকর্তাকর্মচারীর যোগসাজশে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মিজানুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মোবাইল অপারেটরদের কাস্টমার কেয়ার বা বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান ফাঁকফোকর কিংবা থার্ডপার্টি মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টগুলোর তদারকির অভাবেই চক্রগুলো এসব অপরাধ করছে। সাধারণ মানুষ ডিজিটাল সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সুযোগ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ হ্যাকার চক্র। এ ধরনের অপরাধ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও টেলিকম অপারেটরগুলোর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী শোয়েব আলী চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, সাধারণ মানুষের সিম কার্ডের নিরাপত্তা কোথায়? একজন জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে সিম কার্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলছে প্রতারক চক্রএটা কেমন কথা। মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ দায় এড়াতে পারেন না, তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই তো সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, অপরাধকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে মোবাইল অপারেটরদের কাস্টমার কেয়ার কিংবা বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলোর দিকে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগ দিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবরকলে হাতি ও মানুষের বিরল সহাবস্থান
পরবর্তী নিবন্ধরেলপথে এক বছরে কক্সবাজারে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহন