বে টার্মিনাল প্রকল্প নতুন করে গতি পেয়েছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের কাজ অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে। প্রকল্পটির ডিজাইন ঠিকভাবে হয়েছে কিনা তার প্রাথমিক সিমুলেশন পরীক্ষা করতে আগামী সপ্তাহে ৪ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ টিম যাচ্ছে সিঙ্গাপুরে। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত সিমুলেশন সম্পন্ন হবে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পটিতে অর্থায়নের আগে বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক পরিদর্শন করে গেছে বিশ্বব্যাংকের একটি টিম। প্রকল্পের কনসালটেন্ট জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্ট (এইচপিসি) সেলহর্ন এবং বাংলাদেশের কেএস নামের বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি দুই দফা বৈঠক হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, নগরীর হালিশহর উপকূলে আগামী একশ বছরের বন্দর হিসেবে বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিদ্যমান বন্দরের সুযোগ–সুবিধা বাড়িয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। হালিশহর উপকূল থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রানি রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকায় নির্মিত হতে যাওয়া বে টার্মিনালে মোট তিনটি টার্মিনাল থাকবে। দুটি কন্টেনার টার্মিনালের একটি নির্মাণ করবে পিএসএ সিঙ্গাপুর এবং অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। জিটুজি চুক্তির আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওই দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করার কথা। তৃতীয় টার্মিনালটি হবে মাল্টিপারপাস। সেটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণের কথা থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া টার্মিনালটি চালু করতে হলে সবচেয়ে আগে ব্রেকওয়াটার ও অ্যাকসেস চ্যানেল নির্মাণ করতে হবে। যেটি এই প্রকল্পের অন্যতম বৃহৎ কাজ। এছাড়া রাস্তা ও রেল সংযোগ সড়ক, ড্রেনেজ সিস্টেমসহ আনুষঙ্গিক কাজ রয়েছে।
বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি) নামের প্রকল্পটিতে এসব কাজের একটি সমন্বয় করে ডিজাইন তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্ট (এইচপিসি) সেলহর্ন এবং বাংলাদেশের কেএস বছরব্যাপী সার্ভে করে বে টার্মিনালের ব্যাপারে যে রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে তাতে সাগর ভরাট করে ভূমি উদ্ধার করে স্ট্রাকচার এবং সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে। ইতোমধ্যে তারা ডিজাইন তৈরির কাজ অনেকটা গুছিয়ে এনেছে। প্রকল্পটিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয়ের বেশিরভাগ যোগান দেবে বিশ্বব্যাংক। বে টার্মিনালের চ্যানেল এবং ব্রেকওয়াটার নির্মাণ করার জন্য ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করবে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া বে টার্মিনালের সাথে রেলওয়ে ও মহাসড়কের সংযোগ স্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নতুন করে ১৯২ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। প্রস্তাবিত বিটিএমআইডিপি প্রকল্পে ব্রেকওয়াটার নির্মাণে ৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেল নির্মাণে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, নেভিগেশনে সহায়ক যন্ত্র স্থাপনে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং রেল ও সড়ক সংযোগসহ অন্যান্য স্থাপনার সাথে সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন বা ১০ হাজার ২৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকার যোগান দেবে বিশ্বব্যাংক। বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রদান করার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পেয়েছে বেশ কয়েক মাস আগে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু তথা ব্রেকওয়াটার এবং চ্যানেল তৈরির কাজের পুরোটা নির্ভর করছে বিশ্বব্যাংকের উপর। বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছাড়সহ অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুনে নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হচ্ছে না। তবে শীঘ্রই এই প্রকল্পের ব্রেকওয়াটার নির্মাণ, নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেল তৈরি এবং সাগর ভরাট করে ভূমি রিক্লেইমের কাজের পাশাপাশি ইয়ার্ড নির্মাণ, ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
প্রকল্পটির যে ডিজাইন করা হয়েছে তা ঠিকভাবে কাজ করবে কিনা সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিমুলেশন পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর চ্যানেল এবং টার্মিনাল এলাকায় জাহাজ চলাচল ও মুভমেন্ট, জাহাজ ঘোরানো প্রভৃতি বিষয়গুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে দেখার নামই সিমুলেশন। কম্পিউটারেই তৈরি করা হবে বে টার্মিনাল, সেখানে জাহাজের মুভমেন্ট ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে। শুরুতে টু–ডি (দুই ডাইমেনশন) সিমুলেশন করা হবে। যা করা হবে সিঙ্গাপুরে। এই পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের চার সদস্যের একটি টিম আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক কমডোর মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম, বন্দরের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোস্তাহিদ এবং গাউসুল আজম রাসেল টিমটিতে রয়েছেন। টু–ডি সিমুলেশন সম্পন্ন করে সবকিছু ঠিকভাবে পেলে চূড়ান্ত সিমুলেশন (থ্রি ডাইমেশন ) পরীক্ষা করা হবে। এটা করা হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়।
বন্দরের কর্মকর্তারা বলেছেন, বে টার্মিনাল প্রকল্প গতি পেয়েছে। প্রকল্পের টেন্ডার ডকুমেন্টস তৈরিসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রমও এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু মিলে অচিরেই এই প্রকল্পের অনেক কাজ দৃশ্যমান হবে। তারা বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে ৩২ লাখ টিইইউএসের বেশি কন্টেনার হ্যান্ডলিং করে, কিন্তু বে টার্মিনালে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকবে। বে টার্মিনালে বিদ্যমান বন্দরের মতো জোয়ার–ভাটার নির্ভরতা, দিন–রাত ও বাঁকা চ্যানেলের ঝামেলা থাকবে না। রাতে–দিনে যে–কোনো সময় বড় সাইজের মাদার ভ্যাসেল এই টার্মিনালে নোঙর করতে পারবে। ১৩ মিটার ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে ভিড়তে পারবে।
বর্তমান বন্দর চ্যানেলে মাঝারি আকৃতির মাত্র সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। জাহাজকে দুটি বাঁক অতিক্রম করতে হয় এবং দিনের মাত্র চার ঘণ্টা সময় নেভিগেশনের সুযোগ থাকে। কিন্তু বে টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ পরিচালনা করা যাবে। বর্তমানে যেসব ছোট ফিডার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে কন্টেনার পরিবহন করে, বে টার্মিনালে এই ধরনের চার–পাঁচটি জাহাজের পণ্য একটি জাহাজই বহন করে আনা–নেওয়া করবে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে যাওয়া বে টার্মিনাল চালু হলে দেশের গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব অনেকটাই ঘুচে যাবে।














