বিয়ের আনন্দ কেড়ে নিল কাভার্ডভ্যান

কনে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর আগেই লাশ হয়ে ফিরল ভাই-বোন কর্ণফুলীতে কাভার্ডভ্যান-মাইক্রো সংঘর্ষে নিহত ৪

কর্ণফুলী প্রতিনিধি | সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ

একদিকে নতুন বউ গেল শ্বশুরবাড়ি, অন্যদিকে তারই আপন ভাই ও বোন বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বস্তি নিয়ে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটি পরিণত হলো চারজনের নিথর দেহ আর স্বজনদের আহাজারিতে।

গত শনিবার রাতে কঙবাজারের ঈদগাঁও এলাকার মোরশেদ নেওয়াজ মেহেদী ও তার বোন মাদ্রাসাছাত্রী জাছিয়া ইসমে মিমতার বড় বোন তাম্মিন ফায়েছা ফাহিমের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদের একটি রেস্তোরাঁয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কঙবাজার থেকে এসেছিলেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় স্বজনরা। বিয়ের অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসব ও আনন্দের রেশ। কিন্তু কে জানত একটি দুঘটনায় তাদের সব উৎসব বিষাদে পরিণত করবে!

গত শনিবার দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে মাইক্রোবাসে করে বাড়ি ফেরার পথে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা কলেজ বাজার এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে যায় তাদের মাইক্রোবাসটি। মুহূর্তেই শেষ হয় হাসিআনন্দ, শুরু হয় স্বজনদের আহাজারি। দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসে থাকা কনে তাম্মিন ফায়েছা ফাহিমের ভাই মোরশেদ নেওয়াজ মেহেদী (২৬), তার বোন মাদ্রাসাছাত্রী জাছিয়া ইসমে মিমতা (১৭), তাদের মামা ফেরদৌস আলম (৫৫) এবং মাইক্রোবাসের চালক হাছান মোহাম্মদ মুন্নার (৪২) মৃত্যু হয়। কনে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর আগেই লাশ হয়ে বাড়ি ফিরল কনের ভাই ও বোন।

নিহত সবার বাড়ি কঙবাজার জেলার ঈদগাঁও উপজেলায়। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিহত মোরশেদমিমতার বাবা মনজুর আলম ও মা নীলুফা ইয়াছমিন। এছাড়া আহত হয়েছেন তাদের স্বজন আবুল কালাম ও আরফা বেগম। অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে ফেরার সময় হয়তো কেউ ভাবেননি এই যাত্রাই তাদের জীবনের শেষ যাত্রা হবে।

নিহত ফেরদৌস আলমের ছেলে তারেক মাহমুদ গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে জানান, চট্টগ্রাম থেকে কঙবাজারের পথে সেই রাতের যাত্রায় গন্তব্য ছিল বাড়ি; কিন্তু চারজনের জন্য পথেই শেষ হয়ে গেছে সব পথচলা। আর দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে গেছেন, তারাও জীবনের সঙ্গে লড়ছেন হাসপাতালের শয্যায়। প্রিয়জনদের সামনে একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে আহত ব্যক্তিদের সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষা। তিনি বলেন, এভাবে বাবা ভাইবোনদের হারিয়ে ফেলব, তা কল্পনাও করিনি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাতে শাহ আমানত সেতু পার হয়ে আসা একটি কাভার্ডভ্যান শিকলবাহা কলেজ বাজার এলাকায় দ্রুতগতিতে ইউটার্ন নেওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের দুই যাত্রী ফেরদৌস আলম ও মিমতার মৃত্যু হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চালক মুন্না ও যাত্রী মেহেদীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসে থাকা আরও সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে কিছু সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিতদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠায়। পরে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

কর্ণফুলী থানার ওসি নূর আহমদ বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন দুটি জব্দ করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই কাভার্ডভ্যানের চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এদিকে এ ঘটনায় গতকাল দুপুরে নিহত পরিবার পক্ষ থেকে কর্ণফুলী থানায় মামলা রজু করেছেন বলে জানিয়েছেন ওসি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি মিথ্যা ঘোষণা যেভাবে বৈধ রপ্তানি চালান হয়ে যায়