জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে একের পর এক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবু দেশের অর্থনীতিতে চারদিক থেকে শুধুই দুঃসংবাদের আলামত দেখা যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন হাহাকার করছেন, সেই সময়ে আরও কিছু নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মঙ্গলবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে। প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি)। এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে, অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থায় ছিল রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। কিন্তু সৌদি আরব ও হুথিদের হামলা–পালটা হামলার কারণে সেখানেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অবস্থা উত্তরণ সহজ নয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই সাহসী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগে এই স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা তৈরি হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে কি না এবং উৎপাদন চালানোর মত অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে কি না, তা ব্যবসায়ী–শিল্পোদ্যোক্তাদের বড় ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার–উল আলম চৌধুরী পারভেজের মতামত প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। সেখানে তিনি বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ হবে কী করে? কে করবে বিনিয়োগ? বিনিয়োগ করলে রিটার্ন আসবে–সে নিশ্চয়তা দেবে কে? যেগুলো আছে, সেগুলো টিকিয়ে রাখাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে। নতুন সরকার এসেছে, ভেবেছিলাম এখন সব ঠিকঠাক মতো চলবে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে–পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অনেকেই হতাশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ এখনও ফিরে আসেনি দেশে; সুদের হার বেশি। জানি না কবে দেশে সুন্দর–স্বাভাবিক পরিবেশ আসবে।’
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “ব্যবসা ও বিনিয়োগ বর্তমানে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে টিকে থাকার জন্য উদ্যোক্তারা লড়াই করছেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট এল। এগুলো ব্যবসার জন্য বড় আঘাত। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমা, বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানা সমপ্রসারণে বিনিয়োগ হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে। এর সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা, নির্ভরশীল জ্বালানির ব্যবস্থা করা ও নীতির ধারাবাহিকতা রাখা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। আর কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা চীনের মতো দেশগুলো দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির আকার বাড়িয়েছে। তাদের সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বেসরকারি খাতকে কেন্দ্র করে প্রবৃদ্ধির কৌশল। বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো বিনিয়োগের ইঞ্জিন পূর্ণগতিতে চলবে কিনা। এর জবাব মিলবে আগামী কয়েক বছরের বিনিয়োগ পরিবেশ, সংস্কারের গতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ওপর। তাঁরা বলেন, এ অবস্থায় সরকারকে বেশ কয়েকটি শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত বিনিয়োগের জন্য সুদহার কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত সরকারি কোম্পানিগুলো হয় অকশনে দিতে হবে, না হয় শেয়ারবাজারে ছাড়তে হবে। তাছাড়া, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার।








