চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজের ড্র্যাগিং বা নোঙর সরে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উত্তাল সাগর, তীব্র জোয়ার–ভাটার স্রোত, বর্ষা মৌসুমের আবহাওয়া এবং বহির্নোঙরে জাহাজের ঘনত্ব, সব মিলিয়ে নোঙর করা জাহাজ হঠাৎ করে নিজের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে পাশের জাহাজের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরপর জাহাজ সংঘর্ষের ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বড় ধরনের প্রাণহানি বা পরিবেশগত বিপর্যয় না ঘটলেও বহির্নোঙরের হোল্ডিং গ্রাউন্ডে প্রচুর পলি জমায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ১৪ আগস্ট দুপুরে বহির্নোঙরের আলফা অ্যাঙ্করেজে তেলবাহী ট্যাংকার এমটি সি স্পাইক এবং নোঙর করে থাকা বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি সানশাইনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ড্র্যাগিং করে একটি জাহাজ অপর জাহাজকে ধাক্কা দেয়। প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী এমটি সি স্পাইক নোঙর করতে যাওয়ার সময় এমভি সানশাইনের উপর গিয়ে পড়ে। এতে এমটি সি স্পাইকের ইঞ্জিনরুমে দুই স্কয়ারফিট ফাটল সৃষ্টি হয় এবং পানি ঢোকে। এতে জাহাজটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটে। পরে ইমার্জেন্সি ব্যাটারি দিয়ে জাহাজের বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, তীব্র স্রোতের কারণে ট্যাংকারটি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারায় দুর্ঘটনার শিকার হয়। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এমটি সি স্পাইকের ইঞ্জিন রুমের পরিবর্তে যদি কার্গো হ্যাজে ফাটল তৈরি হতো তাহলে সাগরে ডিজেল ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটত। এর দুদিন পর গতকাল ভোরে বহির্নোঙরে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার নোঙর করে থাকা একটি খালি জাহাজে ধাক্কা দিয়েছে। ৩৫ হাজার ৩৫০ টন স্ল্যাগ বহনকারী বাল্ক ক্যারিয়ারটির সঙ্গে নোঙর করা জাহাজটির সংঘর্ষ হয়। প্রাথমিকভাবে কোনো হতাহত, পানি প্রবেশ বা দূষণের খবর পাওয়া যায়নি।
সূত্র বলেছে, একই ধরনের ঘটনা এর আগেও বহির্নোঙরে অনেক বার ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ইনস্যুরেন্স ও সেফটি সংস্থাগুলোর পুরনো সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম অ্যাঙ্করেজকে শক্তিশালী জোয়ার–ভাটার স্রোত, দুর্বল হোল্ডিং গ্রাউন্ড এবং অতিরিক্ত জাহাজের অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ড্র্যাগিং’ এবং ‘সুইং’ এক বিষয় নয়। নোঙর করা জাহাজ জোয়ারের সঙ্গে বাতাস ও স্রোতের দিকে ঘুরে নিজের নির্দিষ্ট সুইং সার্কেলের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু অ্যাঙ্করের গ্রিপ নষ্ট হয়ে গেলে জাহাজটি শুধু ঘুরে না, বরং অ্যাঙ্কর চেইন তলদেশে টেনে নিয়ে সামগ্রিকভাবে একদিকে সরে যেতে থাকে। এটিই অ্যাঙ্কর ড্র্যাগিং। জাহাজের গতি খুব বেশি না হলেও আশপাশে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটতে পারে।
বহির্নোঙরে এ ঝুঁকি বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সেফটি সংস্থাগুলো সতর্ক করে আসছে। বহির্নোঙরে শক্তিশালী স্রোত, প্রচুর পলি জমার কারণে সাগরের তলদেশ নরম থাকা এবং জাহাজের ঘনত্বকে অ্যাঙ্কর ড্র্যাগিংয়ের প্রধান কারণ বলে অভিজ্ঞ একাধিক ক্যাপ্টেন গতকাল আজাদীকে জানান। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময় একটি জাহাজ অ্যাঙ্কর ড্র্যাগ করে পাশের জাহাজের ওপর গিয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে দুই জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আরো কয়েকটি জাহাজের দিকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বহির্নোঙরে স্রোতের তীব্রতা জোয়ার–ভাটার সময় বেশি হতে পারে। ২০২৫ সালের একটি মেরিটাইম সেফটি অ্যাডভাইজরিতে চট্টগ্রাম ও কুতুবদিয়া অ্যাঙ্করেজে ৪ থেকে ৬ নট পর্যন্ত শক্তিশালী জোয়ারের স্রোতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নরম কাদামাটির তলদেশ এবং ঘন নৌযান অবস্থানকে নেভিগেশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অভিজ্ঞ একজন ক্যাপ্টেন বলেন, একটি জাহাজ নোঙর ফেলার পর শুধু অ্যাঙ্কর ঠিকমতো বসেছে কি না দেখলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জাহাজটি নোঙর করার পরও নিয়মিত ‘অ্যাঙ্কর ওয়াচ’ করতে হয়। জাহাজের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) অবস্থান, অ্যাঙ্করের অবস্থান, জাহাজের বিয়ারিং, আশপাশের জাহাজের দূরত্ব এবং স্রোতের পরিবর্তন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে হয়। অবস্থানের পরিবর্তন অস্বাভাবিক হলেই বুঝতে হবে জাহাজটি ড্র্যাগ করছে।
মেরিটাইম সেফটি বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্র্যাগিং শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সময়। অ্যাঙ্কর ড্র্রাগ করছে, এটি যত দ্রুত ধরা পড়ে ততই ঝুঁকি কমে। বিষয়টি বুঝতে দেরি হলে বিপদ বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। ওই ধরনের পরিস্থিতিতে অ্যাঙ্কর তুলে নেওয়ার পাশাপাশি মূল ইঞ্জিন চালু করে জাহাজের হেডিং নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। প্রয়োজনে অতিরিক্ত অ্যাঙ্কর ব্যবহার করতে হয় এবং আশপাশের জাহাজকে সতর্ক করতে হয়।
চট্টগ্রাম অ্যাঙ্করেজ নিয়ে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম গাইডলাইনগুলোতেও মূল ইঞ্জিন প্রস্তুত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মেরিটাইম ইন্সুরেন্স এবং প্রটেকশন অ্যান্ড ইনডেমনিটি সংস্থার (জিএআরডি) নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ অ্যাঙ্করেজে ড্র্যাগিং শুরু হওয়ার পর ইঞ্জিন চালু করতে দেরি হলে সংঘর্ষ বা গ্রাউন্ডিং ঠেকানোর সুযোগ দ্রুত কমে যায়। বিশেষ করে জোয়ার বা শক্তিশালী স্রোতের সময় ইঞ্জিন ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে।
বহির্নোঙরে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক জাহাজ অবস্থান করে। কোনো কোনো জাহাজ নোঙর করে কার্গো লাইটারিং করে, কোনোটি বন্দরে প্রবেশের সিরিয়ালের অপেক্ষায় থাকে, আবার কোনোটি আবহাওয়া বা অপারেশনাল কারণে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। ফলে একটি জাহাজ ড্র্যাগ করলে তার নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি আশপাশের জাহাজকেও ঝুঁকি মুখে ফেলে।
বহির্নোঙরে একসঙ্গে ৮০–৯০টি পর্যন্ত জাহাজ নোঙর করে থাকে। এর মধ্যে স্ক্র্যাপ জাহাজও অবস্থান করে। বর্ষা মৌসুমে ৪ থেকে ৬ নট শক্তিশালী স্রোত এবং দুর্বল হোল্ডিং গ্রাউন্ডের কারণে অ্যাঙ্কর ড্র্যাগ করার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে দুটি ঘটনায় চারটি জাহাজের দুর্ঘটনার শিকার হওয়া সেই আশঙ্কাকে আরো প্রকট করে তুলেছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে জাহাজের আকার ও সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকিও ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। আগে একটি ছোট জাহাজ ড্র্যাগ করলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত থাকার সম্ভাবনা ছিল। এখন ৩০ হাজার টন থেকে এক লাখ টন পর্যন্ত পণ্য নিয়ে আসা বড় জাহাজগুলো ড্র্যাগ করে অন্য জাহাজকে ধাক্কা দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে তেলবাহী ট্যাংকারের ক্ষেত্রে সংঘর্ষের ঘটনার সাথে বড় অগ্নিকাণ্ড ও সমুদ্রে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি থাকে।
নৌ বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরের বহির্নোঙরে এখন অ্যাঙ্করেজ রিস্ক ম্যাপিং করা জরুরি। কোন এলাকায় তলদেশের হোল্ডিং ক্ষমতা কত, কোন অংশে স্রোতের গতি বেশি, কোন জায়গায় জাহাজের ঘনত্ব বেশি এবং বাতাসের গতিতে কোন এলাকায় ড্র্যাগিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে, এসব তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে জাহাজ নোঙর করার সময় ন্যূনতম দূরত্বের বিষয়টি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কারণ একটি জাহাজের নিরাপদ সুইং সার্কেল যত বড়, ড্র্যাগিংয়ের সময় তার সম্ভাব্য ক্ষতির এলাকাও তত বড়। পাশাপাশি জাহাজের ড্রাফট, অ্যাঙ্কর চেইনের দৈর্ঘ্য, পানির গভীরতা ও স্রোতের গতি বিবেচনায় রেখে জাহাজ নোঙর করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু নিজের জাহাজ ড্র্যাগ করছে কি না তা দেখলেই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না, আশপাশের কোনো জাহাজ ড্র্যাগ করছে কি না তাও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার পরামর্শ দিয়ে নৌ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অ্যাঙ্করেজে অবস্থানরত প্রতিটি জাহাজের এআইএস ট্র্যাক, জিপিএস পজিশন এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে কোনো জাহাজ তার নির্ধারিত অ্যাঙ্কর পজিশন থেকে অস্বাভাবিকভাবে সরে গেলেই সতর্ক হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে ড্র্যাগিং নতুন কোনো ঘটনা নয়। নতুন বিষয় হলো, জাহাজের আকার ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। একটি ড্র্যাগিংয়ের ঘটনা এখন অনেক বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে উল্লেখ করে তারা বলেন, একটি জাহাজ অন্য জাহাজে ধাক্কা দিলে দ্বিতীয়টি আবার তৃতীয় জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে। এভাবে চেইন কোলিশন বা ধারাবাহিক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোতের সময় অ্যাঙ্করেজের জাহাজগুলোর জন্য আলাদা সতর্কতা, নিয়মিত অ্যাঙ্কর ওয়াচ, ইঞ্জিন স্ট্যান্ডবাই, পর্যাপ্ত অ্যাঙ্কর চেইন এবং নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।












