আগামী শতকে মনুষ্য প্রজাতিকে অবশ্যই ভিনগ্রহে পাড়ি দিতে হবে। কেন প্রশ্ন করে লাভ নেই। ১০০টি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বলা যাবে শতাব্দী ব্যবধানে ভিনগ্রহে নতুন বাসস্থান তৈরী ছাড়া উপায় থাকবে না। স্টিফেন হকিং প্রথম জোরালোভাবে উত্থাপন করলেও এখন প্রথম শ্রেণির মহাকাশ বিজ্ঞানীরা ভাবছেন কিভাবে যাওয়া যাবে, ভিনগ্রহের আবহাওয়াকে আয়ত্তে আনা যাবে, বাসগৃহ বানানো যাবে এবং কিভাবে বেঁচে থাকার মতো অক্সিজেন আর জলের সংস্থান করা যাবে তা নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন। গত অর্ধশতক ধরে সৌরজগতের বাইরে অথচ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর অভ্যন্তরে ৪টি গ্রহের সন্ধান মিলেছে। এদের নাম দেয়া হয়েছে ১. কেপলার–৪৫২বি, ২. প্রক্সিমা সেন্টুয়া বি–বি, ৩. ট্রাপিস্ট–আই.ই, ৪. কেপলার– ১৮৬ এফ আই (ভর)। পৃথিবী–সদৃশ উক্ত ৪টি গ্রহ’ই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে নিজ নিজ নক্ষত্র থেকে গ্রহণযোগ্য দূরত্বে বা হেভিটেবল এ অবস্থিত। আমাদের নক্ষত্র সূর্য্যের মধ্যে দুটো গ্রহ শুক্র ও মঙ্গলকে বাসযোগ্য করার চিন্তাভাবনা, বহুদিন থেকে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ইদানীং শনির উপগ্রহ টাইটানকে ঘিরেও বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন।
প্রথমত কেপলার– ৪৫২বি, কেপলার– ১৮৬ এফআই, প্রক্সিমা সেন্টুয়ারি বি, ট্রাপিস্ট আই.ই, আমাদের গ্যালাক্সির অন্তর্গত হলেও পৃথিবী থেকে এতদূরে যে ওখানে পৌঁছার জন্য হাজারো আলোকবর্ষ পথ অতিক্রম করতে হবে। মানুষের হাতে অত দ্রুতগতির কোন রকেট বর্তমানে তো নেই। এমনকি নিকট ভবিষ্যতেও ঐরূপ দ্রুতগতির বা শর্টকাট কোন রাস্তা বের না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অনেকের ধারণা মানুষের পক্ষে বহু প্রজন্ম পর্যন্ত ঐসব গ্রহে পা রাখা নিতান্তই দুঃস্বপ্ন। আমাদের সৌরজগতের শুক্র পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী হলেও পৃষ্ঠদেশে অত্যধিক তাপমাত্রা, পৃথিবী পৃষ্ঠের তুলনায় ৯০ গুণ বেশী বায়ুচাপ ও বায়ুমণ্ডলের ঘন কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফিউরিক এসিড মেঘের আচ্ছাদনের কারনে প্রাণ টিকে থাকা অসম্ভব। যদিও এই গ্রহটির দুরত্ব ৪১ মিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করতে বড়জোর ৫ মাস সময় লাগতে পারে। এজন্য শুক্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০ কিলোমিটার উপরে যেহেতু বায়ুর চাপ পৃথিবী পৃষ্ঠের সমতুল্য সেহেতু মানুষ যদি দূর ভবিষ্যতে ভাসমান বসতি প্রয়োগ করতে সক্ষম হয় (অনেকটা মহাকাশ স্টেশনের মতো) তবে শুক্রে ভাসমান মনুষ্য বসতি সম্ভব।
কিছুদিন আগ পর্যন্ত মঙ্গলে বসতি স্থাপন সব’চে বেশি প্রাধান্য পেয়ে আসছিল। মঙ্গলে কোটি কোটি বছর আগে জল ছিল। বায়ুমণ্ডল ছিল। বায়ুমণ্ডলের দুর্বলতার কারণে ধীরে ধীরে জল উধাও হয়েছে এবং ধীরে ধীরে বাধাহীন ভাবে মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি মঙ্গলপৃষ্ঠকে করেছে শুষ্ক ও রক্তিম। জলের প্রয়োজনে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত আনা গেলে গড় তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রী থেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। উন্নত করতে হবে চৌম্বক ক্ষেত্র, অক্সিজেনের অনুপাত। স্পেস এক্সের ইলন মাক্সের সোজা কথা এটমিক চার্জ করে কয়েক দশকের জন্য মঙ্গলকে ধুলোর মেঘে ঢেকে দেয়া হবে। একদিন ঐ ধুলো থেকে মেঘ হবে, বৃষ্টি হবে, মঙ্গলের পৃষ্ঠে একদিন ঘাস গজাতে বাধ্য। অনুপ্রাণ এখনো মঙ্গলের যে কোন স্তরে বিদ্যমান মর্মে ধারণা। পৃথিবী থেকে না পাঠালেও ধীরে ধীরে জৈব প্রাণের বিকাশ তাত্ত্বিকভাবে ঘটতে বাধ্য।
মূল সমস্যা হলো বর্তমান প্রযুক্তিতে মঙ্গলে যেতে লাগছে ৭ মাস। রসকসমস ঘোষিত প্লাজমা রকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ৩ মাসে মঙ্গলে পৌঁছা যাবে। এটি ছাড়াও চাঁদে বিরতি স্টেশনের প্রস্তাবিত প্রজেক্ট সফল হলে কয়েকদিন চাঁদে বিরতি দিয়ে আবার উড়াল দিয়ে মঙ্গলে পৌঁছা হয়ে উঠবে স্বপ্ন নয় বাস্তব।
শনির উপগ্রহ টাইটান অনেক দিক থেকে পৃথিবীর মতোই। মাটির নীচে জমাটবদ্ধ জল আছে। পৃষ্ঠদেশে জলের খাল নদী বিল না থাকলেও মিথেনের নদী সমুদ্র সহ সব কিছুই আছে। একদল বিজ্ঞানীর মতে ৭৮ ভাগ নাইট্রোজেনের পৃথিবীতে প্রাণের অস্বিত্ব আছে প্রায় ২১ ভাগ অক্সিজেনের কারনে। তেমনি টাইটানের ৯৪ ভাগ নাইট্রোজেন এবং সাথে ৫ ভাগ মিথেন ও ১ ভাগ অন্যান্য গ্যাসের কারনে কোন না কোন ধরনের প্রাণ থেকে থাকতে পারে। উপগ্রহটিতে মিথেন বৃষ্টি হয় কয়েক শতাব্দি ব্যবধানে পৃথিবীর মতো হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সৃষ্ঠ জলীয় বৃষ্টি একদিন হবে। খুব সহজ কথায় পৃথিবীর মতো প্রাণ বিকাশের জন্য উপগ্রহ টাইটান মোটামুটি পৃথিবীর কাছাকাছি তবে সবচেয়ে জটিল সমস্যা টাইটানে যেতে বর্তমান প্রযুক্তিতে লেগে যাচ্ছে প্রায় ৯ বছর। এজন্য টাইটান, শুক্র, চাঁদকে বাদ দিয়ে আপাতত মঙ্গলকে ঘিরে সভ্যতা স্থানান্তরে লেগে যাওয়াই উত্তম। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা দ্বাবিংশ শতক হবে মানুষের মঙ্গলে নিয়মিত যাতায়াতের সোনালি সময়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, আইনজীবী।












