টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পানিতে চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘেরের বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। একই সঙ্গে পানির নিচে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
প্রাথমিক হিসাবে জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার। পাশাপাশি ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে চট্টগ্রামের মাছচাষিদের ওপর। বিশেষ করে বাঁশখালী উপজেলায় মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। প্রাথমিক হিসাবে সেখানে ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আকস্মিক পানির স্রোতে ঘের ও পুকুরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় অনেক চাষি মুহূর্তেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বছরের পর বছর ধরে লালন করা মাছ এক নিমেষে ভেসে যাওয়ায় অনেক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘এবারের দুর্যোগে চট্টগ্রামের মৎস্য খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’ অন্যদিকে, বন্যার পানিতে কৃষি খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি তৈরি করেনি, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে চট্টগ্রামের গ্রামীণ অর্থনীতিতে। মাছচাষিদের উৎপাদন হারানো, কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া এবং নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় হাজারো পরিবার সংকটে পড়তে পারে। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্যার প্রাদুর্ভাব এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবজনিত বিপর্যয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভঙ্গুর দশা তৈরি হয়েছে। উৎপাদনে না ফেরা পর্যন্ত থমকে থাকবে গ্রামীণ শিল্পের অনেক উদ্যোগ। পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব। এমনকি অনেকেই ঋণ করার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছেন। এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থানে। বাড়তে পারে কাজের সন্ধানে শহরমুখী মানুষের ঢল।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর গ্রামীণ অর্থনীতি এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের বেঁচে থাকাই এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। আবার ঋণপ্রবাহ কমে আসায় তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও পিছিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে নানা খাতে। তাই গ্রামে ঋণ প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো তৎপর হতে হবে। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’ তবে আনন্দের বিষয়, বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ইউনিয়ন–ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তালিকা প্রণয়নের কাজ শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে সরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সামপ্রতিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষিজমি, ফসল এবং কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নিরূপণে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর ক্ষতির ধরন অনুযায়ী কৃষকদের বীজ, সার, কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত আবার কৃষিকাজে ফিরতে পারেন। কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সব সময় আন্তরিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ আসলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।






