ফেলনা মাছে নতুন সম্ভাবনা

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

কেউ খেত না বলেই একসময়ে যে মাছ উল্টো সাগরে ফেলে দেয়া হতো, সেই ‘ফেলনা’ মাছ দিয়েই এখন আসছে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা, সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তবে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে রপ্তানিতে ধস নেমেছে প্রক্রিয়াজাত এ শিল্পে। করোনার ধাক্কা সামলাতে সরকারি সহযোগিতার দাবি করেছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।
জানা যায়, সাগর থেকে মাছ শিকার করা হলেও সব মাছ খাওয়ার যোগ্য থাকে না। আবার সাগরের সব মাছই বাংলাদেশের মানুষ খান না। তাই জালে ধরা পড়লেও কাটেল ফিস, রিবন ফিস, টাং সোল, ইয়েলো ক্রোকার জাতের মাছ ৭-৮ বছর আগেও সাগরে ফেলে দেওয়া হতো। সাগরের অন্য মাছেরা এসব খেত। আমাদের দেশে না খেলেও বিশ্বের অনেক দেশে রয়েছে এসব মাছের চাহিদা। বিশেষ করে চায়না, জাপান, দুবাই, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত বিশ্বের দেশে রয়েছে এসব মাছের চাহিদা।। গত ৬-৭ বছর ধরে এসব জলজপ্রাণী প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি শুরু করেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। তন্মধ্যে অন্যতম সৌমেন্দু বসু। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে নিহাও ফুড কোম্পানি নামে ‘নন ট্রেডিশনাল’ সী ফিসের প্রক্রিয়াজাত কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ঘোষিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (রৌপ্য ট্রফি) পেয়েছে নিহাও ফুড কোম্পানি। তবে করোনাকালীন বন্ধ রয়েছে এসব পণ্যের রপ্তানি।
নিহাও ফুড কোম্পানির স্বত্তাধিকারী সৌমেন্দু বসু দৈনিক আজাদীকে বলেন, সামুদ্রিক অপ্রচলিত মাছগুলোর মধ্যে কাটেল ফিস, রিবন ফিস, টাং সোল, ইয়েলো ক্রোকার অন্যতম। এসব ননট্রেডিশনাল ফিশ আইটেম রপ্তানি করে গতবারের জাতীয় রপ্তানি ট্রফিও পেয়েছি।’ তিনি বলেন, বিশ্বে এধরণের সামুদ্রিক মাছের চাহিদা অনেক। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে একশ থেকে সোয়া’শ কোটি টাকার মাছ রপ্তানি হচ্ছে। সারাদেশে আমরা ৫ উদ্যোক্তা এ ধরণের পণ্য রপ্তানি করি। বর্তমানে বছরে প্রায় চার-পাঁচ হাজার টন রপ্তানি হচ্ছে। চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। প্রধানত চীনে বেশি রপ্তানি হয়। আমাদের দেশে না খেলেও চীনে এসব খাবার খুবই জনপ্রিয়।
এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘করোনা আমাদের ব্যবসাকে তছনছ করে দিয়েছে। রপ্তানি বন্ধ থাকায় পুরো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। অথচ আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদ বহন করতে হচ্ছে। রপ্তানি বন্ধ থাকলেও জনবল ছাটাই করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ব্যয় নিয়মিত রয়েছে। যতই দিন গড়াচ্ছে, আর্থিকভাবে ততই আমরা চাপে পড়ছি।’
চায়নাতে ননট্রেডিশনাল প্রসেসড ফিস রপ্তানি করেন সদরঘাট এলাকার মেসার্স শাহেদ ব্রাদার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারী মো. শাহেদুর রহমান শাহেদ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘যেসব মাছ আমাদের দেশের মানুষ খান না, সেইসব অপ্রচলিত সামুদ্রিক মৎস্য আমরা রপ্তানি করে থাকি। ৬ বছর ধরে আমি চায়নাতে প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে রপ্তানি করে আসছি। চলতি মৌসুমে গত আগস্ট হতে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি টাকার রপ্তানি আয় হয়েছে আমার। কোভিডের কারণে চায়না সব ধরণের আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। যে কারণে গত মাস থেকে এঙপোর্ট বন্ধ রয়েছে।’ তিনি বলেন, এগুলো আগে ফেলে দেওয়া হতো। এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ শিল্পের জন্য স্বল্পসূদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে আরো নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে।’
আরেক রপ্তানিকারক মেসার্স ফিস গার্ডেনের পরিচালক ছৈয়দ আহমদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমরা কয়েকবছর ধরে নন ট্রেডিশনাল সী ফিস রপ্তানি করে আসছি। করোনার কারণে এখন অনেক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। এঙপোর্টও বন্ধ হয়ে গেছে। এঙপোর্ট বন্ধ হওয়ায় অনেক মাছ আমাদের হিমাগারে জমা হয়ে আছে। রপ্তানি বন্ধ হলেও ব্যাংক ইন্টারেস্টতো বন্ধ হয়নি। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছি। এখন সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ৪শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা উপকৃত হতো।’
বাংলাদেশ নন ফ্যাকার্স ফ্রোজেন ফুডস এঙপোর্ট এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুব রানা দৈনিক আজাদীকে বলেন, আগে এসব জলজপ্রাণী ট্রলার কিংবা জাহাজ থেকে ফেলা দেওয়া হতো। এখন এসব রপ্তানি হয়ে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আহরিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব শিল্পকে সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন। করোনার কারণে এসব পণ্য রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এসব রপ্তানিমুখী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে খন্ডকালীন সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন আমদানি-রপ্তানি শিল্পে জড়িত এ ব্যবসায়ী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউন্মুক্ত স্থানে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন নয় ইনডোরেও লাগবে অনুমতি : সিএমপি
পরবর্তী নিবন্ধজাল নোট দিয়ে দামি মোবাইল ও ল্যাপটপ কিনে তারা