ফিশারিঘাটে ভোর থেকে জমে ওঠে ‘অভিজ্ঞতার বাজার’

কম দামে টাটকা মাছ কিনতে ভিড় ক্রেতাদের

নেজাম উদ্দীন আবির | সোমবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

কোথাও নেই দাঁড়িপাল্লা, নেই কোনো ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র। মাছ বিক্রির সময় নেই নির্দিষ্ট কোনো কেজির হিসাবও। অথচ প্রতিদিন ভোরে এখানে বসে যায় জমজমাট মাছের বাজার। মাছের দাম নির্ধারণ হয় অভিজ্ঞতা, চোখের আন্দাজ ও দরকষাকষিতে। আর ওজনের হিসাব চলে মাছের স্তূপ, ঝুড়ি কিংবা স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত ‘টিয়াটুংখা’কে ঘিরে।

এটি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফিশারীঘাটের পূর্ব প্রান্তের মাছের বাজার। সাগর থেকে মাছ নিয়ে আসা নৌকা ঘাটে ভিড়তে শুরু করে গভীর রাতে। রাত দুইটাতিনটা থেকে মাছ নামানোর কাজ শুরু হলেও সাধারণ ক্রেতা, মাছশ্রমিক ও পাইকারদের আনাগোনায় বাজার জমে ওঠে ভোরের পর। সকাল ছয়টা থেকে প্রায় দশটা পর্যন্ত থাকে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা। ঘাটে আসা মাছের একটি অংশ চলে যায় আড়ত ও পাইকারদের মাধ্যমে। আবার মাছশ্রমিকদের অনেকে সওদাগর বা আড়তদারের কাছ থেকে বকশিস হিসেবে পাওয়া মাছ সরাসরি সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন। কেউ কেউ এক পক্ষের কাছে পাইকারি দরে মাছ বিক্রি করে দেন। পরে সেই মাছই শহরের বিভিন্ন খুচরা বাজারে বা অলিগলিতে বিক্রি হয়।

ফলে ফিশারীঘাটের এই বাজার হয়ে উঠেছে এক ধরনের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা। মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় অনেক সময় সাধারণ খুচরা বাজারের চেয়ে কম দামে এখানে মাছ পাওয়া যায়। তবে এই বাজারের সুবিধা নিতে হলে ক্রেতাকে হতে হয় অভিজ্ঞ। কারণ এখানে কেজি ধরে মাছ কেনার প্রচলিত পদ্ধতির বদলে দরকষাকষি ও পরিমাণের আন্দাজই বড় বিষয়।

ফিশারীঘাটের পূর্ব পাশে মাছশ্রমিকদের বসানো বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোএখানে প্রচলিত অর্থে কোনো ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। ক্রেতা মাছের স্তূপ দেখে দাম জানতে চান। বিক্রেতা মাছের পরিমাণ, আকার ও প্রজাতি দেখে একটি দাম বলেন। এরপর চলে দরকষাকষি। একজন অভিজ্ঞ ক্রেতা অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে নিতে পারেন কোন স্তূপে কত মাছ রয়েছে, মাছের বাজারদর কত এবং কোন বিক্রেতার কাছ থেকে তুলনামূলক ভালো দামে মাছ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু নতুন ক্রেতার জন্য বিষয়টি এতটা সহজ নয়।

স্থানীয়দের ভাষায়, এই বাজারে ‘চোখের মাপ’ ও ‘অভিজ্ঞতাই’ এক ধরনের ওজন মাপার যন্ত্র। তাই নিয়মিত ক্রেতারা এখানে এসে সুবিধা পেলেও অনভিজ্ঞ ক্রেতারা কখনো কখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম মাছ নিয়ে ফিরতে পারেন। ফিশারীঘাটের মাছশ্রমিকদের একটি অংশ সাগর থেকে আসা মাছ নৌকা থেকে নামানো, বাছাই ও পরিবহনের কাজে যুক্ত। কাজের বিনিময়ে মজুরি ছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সওদাগর বা আড়তদারের কাছ থেকে মাছ বকশিস হিসেবে পান শ্রমিকরা। এই মাছই অনেক শ্রমিকের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস। কেউ ঘাটেই বসে মাছ বিক্রি করেন, আবার কেউ পাইকারের কাছে বিক্রি করে দেন। রাতের আঁধার কাটার আগেই ফিশারীঘাটে শুরু হয় মাছ নামানোর ব্যস্ততা। একদিকে নৌকা থেকে মাছ নামছে, অন্যদিকে শ্রমিকরা মাছ বাছাই করছেন। কোথাও চলছে বরফ দেওয়ার কাজ, কোথাও চলছে দরদাম। ভোর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সকাল ছয়টা থেকে দশটা পর্যন্ত ঘাটের পূর্ব পাশে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে অনেকে এখানে আসেন। আবাসিক মাদ্রাসা, হোস্টেল, হোটেল ও খাবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই তুলনামূলক কম দামে মাছ সংগ্রহ করতে এই বাজারে আসেন। গৃহস্থালির জন্য মাছ কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতারাও টাটকা মাছ ও তুলনামূলক কম দামের আশায় এখানে ভিড় করেন। মুরাদপুরের বাসিন্দা ফকির মিয়া। তাঁর পরিবারের সদস্যরা সামুদ্রিক মাছ খেতে পছন্দ করেন। তাই সস্তা দামে মাছ কিনতে প্রায়ই ফিশারীঘাটে আসেন তিনি। ফকির মিয়া বলেন, “ফিশারীঘাটে মাছ কিনতে আসি কারণ এখানে অনেক সময় খুচরা বাজারের তুলনায় কম দামে টাটকা মাছ পাওয়া যায়। তবে এখানে কেজি মেপে না দেওয়ায় মাছের পরিমাণ বুঝতে অভিজ্ঞতা লাগে।” নগরীর হালিশহর থেকে এসেছেন আক্তার পারভেজ। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবারে তিনি এখানে মাছ কিনতে আসেন। তিনি বলেন, “আমি নিয়মিত এখান থেকে মাছ কিনি। মাছের মান ও দাম দুটোই দেখেই কিনতে হয়। যারা নতুন, তাদের জন্য একটু সমস্যা হতে পারে। তবে ভালোভাবে দেখে ও দরদাম করে কিনতে পারলে লাভ হয়।”

মাছশ্রমিক রানু আক্তার দীর্ঘদিন ধরে মাছের বরফ দেওয়ার কাজ করেন। বকশিশ হিসেবে পাওয়া মাছ মাঝেমধ্যে তিনি ঘরে নিয়ে যান। আবার কখনো ফিশারীঘাটের এই বাজারে বিক্রি করেন। রানু আক্তার বলেন, “সওদাগরের কাছ থেকে যে মাছ বকশিস হিসেবে পাই, সেগুলো এখানে বিক্রি করি। এখানে বিক্রি করলে সরাসরি ক্রেতার কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায়। প্রতিদিন মাছের পরিমাণ একরকম থাকে না, তাই আয়ও একরকম হয় না।”

ফিশারীঘাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সামুদ্রিক মাছ। সাগর থেকে আসা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে সরাসরি পৌঁছানোর কারণে মাছের সতেজতা নিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ থাকে বেশি।

ফিশারীঘাট থেকে শুধু নগরীর বাজারগুলোতেই মাছ যায় না। অনেক ক্ষুদ্র বিক্রেতা এখান থেকে কম দামে মাছ সংগ্রহ করে নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। সকালে ঘাট থেকে মাছ সংগ্রহ করে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ ছোট পরিবহন ব্যবহার করে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় চলে যান। পরে সেসব মাছ স্থানীয় মহল্লায় খুচরা দরে বিক্রি করেন। এতে একদিকে ঘাটের মাছ দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়, অন্যদিকে স্বল্প পুঁজির মানুষের জন্য তৈরি হয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ।

ফিশারীঘাটের মাছের বাজারকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি কেবল সস্তায় মাছ কেনাবেচার একটি জায়গা। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র। রাতের অন্ধকারে নৌকা ঘাটে ভেড়ানো থেকে শুরু করে মাছ নামানো, বাছাই, বহন, বরফ দেওয়া, আড়তে তোলা, শ্রমিকের বকশিসের মাছ বিক্রি এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার রান্নাঘরে পৌঁছানোপ্রতিটি ধাপেই যুক্ত রয়েছে অসংখ্য মানুষ। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটের কোলাহলও বাড়ে। কেউ মাছ নিয়ে ছুটছেন, কেউ ক্রেতা খুঁজছেন, কেউ দরদাম করছেন। আবার কেউ ঝুড়ি ভর্তি মাছ নিয়ে শহরের অলিগলির দিকে রওনা দিচ্ছেন। ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল দশটা পেরোয়, তখন ধীরে ধীরে কমতে থাকে ভিড়। কিন্তু তার আগেই দিনের বড় একটি বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। দাঁড়িপাল্লা নেই, নেই ডিজিটাল মাপযন্ত্রআছে মাছ, ক্রেতাবিক্রেতার দরকষাকষি আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। টিয়াটুংখার ওপর সাজানো মাছের স্তূপ ঘিরে প্রতিদিন ভোরে যে বাজার বসে, সেটিই ফিশারীঘাটের আরেকটি স্বতন্ত্র চিত্র।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমডেল রিধিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় প্রেমিক কারাগারে
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামসহ সারা দেশে নজরুল বর্ষের কার্যক্রম ৩১ আগস্ট থেকে