ফিরে আসুক বিনয় ও সম্মান

এমিলি মজুমদার | রবিবার , ১ মার্চ, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

না, আর না। অপমান, অসম্মান, কটূ কথা, নতুন নতুন বিশ্রী ভাষার গালাগালমনে হচ্ছে যেন অসভ্যতা আর ঔদ্ধত্য ছোঁয়াচে রোগের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বিনয়, নম্রতা, শালীনতাএই শব্দগুলো যেন আজ অভিধানের পাতায় রয়ে গেছে, বাস্তব জীবনে এগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার।

কে কাকে কোথায়, কখন, কিভাবে কথা বলতে হয়সে বোধটুকু যেন উধাও হয়ে গেছে। বড় ছোট, স্থানকালপাত্রের বিবেচনা নেই। চারদিকে তাকালে সবকিছু বড় অচেনা লাগে। বারবার মনে প্রশ্ন জাগেআমরা কি এমন ছিলাম? আমাদের বেড়ে ওঠার সময় কি এমন ভাষা, এমন আচরণ ছিল চারপাশে?

অনেকে বলবেন, পারিবারিক শিক্ষার অভাব। কেউ বলবেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। আবার কেউ সমাজকেই দায়ী করবেন। এখন আর কারও ওপর দায় চাপানোর সময় নেই। যে যার নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে। নিজেকে শুধরে নেওয়া, নিজের সন্তানদের, অনুজদের সঠিক পথ দেখানোএই কাজটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছিমানুষ লেখাপড়া শিখে সভ্য হয়, বিনয়ী হয়, সদাচারী হয়। শিক্ষা মানুষকে মার্জিত করে, অন্যকে সম্মান করতে শেখায়, সুন্দর করে কথা বলতে শেখায়। একজন শিক্ষিত মানুষের পরিচয় শুধু তার সার্টিফিকেটে নয়, তার কথাবার্তায়, ব্যবহারে, আচরণে ফুটে ওঠে। কিন্তু আজ যেন সেই চিত্র পুরো উল্টো হয়ে গেছে। তথ্যের বিস্তার ঘটছে, কিন্তু বিবেকের চর্চা কমে যাচ্ছে।

এখন এমন সব অশ্লীল শব্দ, এমন সব কটু গালি ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ঘোরে, যা শুনলে কান গরম হয়ে যায়। দুঃখের বিষয়, এই ক্ষেত্রে মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। ভাষার মধ্যে আজ আর কোনো লজ্জা, সংকোচ, সৌন্দর্য নেই। কথাবার্তার ভঙ্গি, চোখমুখের অভিব্যক্তিসবকিছুতেই কেমন যেন ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়। মনে হয়, এই বুঝি তর্ক থেকে ঝগড়া, ঝগড়া থেকে মারামারি লেগে যাবে। সহনশীলতা নেই, ধৈর্য নেই, অপেক্ষা করার মানসিকতা নেই। সন্তান শুনছে না বাবামায়ের কথা, অনুজ মানছে না অগ্রজের উপদেশ। শ্রদ্ধা শব্দটা যেন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। শিক্ষক, গুরুজন, গুণীজনযারা সমাজের পথপ্রদর্শকতারাও আজ পদে পদে অসম্মানিত হচ্ছেন, নিগৃহীত হচ্ছেন। এই দৃশ্য শুধু কষ্টের নয়, লজ্জারও। ভাষা মানুষের ব্যক্তিত্বের আয়না। সুন্দর, শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার চেষ্টা এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং উদ্ভট, বিকৃত, অশালীন শব্দ ব্যবহারে যেন এক ধরনের গর্ব কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূ মন্তব্য, বিদ্রূপ, ট্রলএসব যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরা ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারাচ্ছি। অন্যকে আঘাত করলে, অপমান করলে, বিদ্রূপ করলেতা যে কারও মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে, সে বোধটুকুও কমে যাচ্ছে।

তবে কি সব শেষ? নিশ্চয়ই না। সমাজ কখনো এক দিনে বদলায় না, আবার এক দিনে ভেঙেও পড়ে না। পরিবর্তন যেমন ধীরে ধীরে এসেছে, সংশোধনও তেমনি ধীরে ধীরে সম্ভব। শুরুটা করতে হবে ঘর থেকে। পরিবারই প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাবামায়ের আচরণ, কথাবার্তা, একে অপরের প্রতি সম্মানএসবই শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। শিশুকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে মূল্যবোধ শেখানো, শালীন ভাষার চর্চা করানো, বড়দের সম্মান করতে শেখানোএসবই প্রকৃত শিক্ষার অংশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও শুধু পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার শেখানোর দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষক শুধু পড়াবেন না, অনুপ্রেরণা দেবেন; শুধু তথ্য দেবেন না, মূল্যবোধও গড়ে তুলবেন। সমাজের গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলসব ক্ষেত্রেই সুস্থ ভাষা ও সুস্থ আচরণের চর্চা বাড়াতে হবে।

আজ যে অবক্ষয়ের ছবি আমরা দেখছি, তা আমাদের হতাশ করে, ব্যথিত করে। কিন্তু এই ব্যথাই হোক পরিবর্তনের প্রেরণা। আমরা আবার বিনয়কে ফিরিয়ে আনতে পারি, শালীন ভাষার চর্চা ফিরিয়ে আনতে পারি, সম্মান আর সৌজন্যকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিযদি আমরা প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে সচেতন হই। আমাদের নিয়েই সমাজ, তাই সমাজকে বদলাতে হলে আমাকে, আপনাকে, আমাদের প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে। অসম্মান আর অশালীনতার অন্ধ স্রোতে ভেসে না গিয়ে, আমাদেরই হতে হবে সৌজন্য আর বিনয়ের আলোকবর্তিকা। তাহলেই হয়তো একদিন আবার গর্ব করে বলতে পারবহ্যাঁ, এটাই আমাদের সমাজ; ভদ্র, মার্জিত, সম্মানবোধে উজ্জ্বল এক সমাজ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ