‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ শিশুদের সুন্দর নিরাপদ শৈশব এবং মায়ের চিরন্তন মাতৃত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে উক্তির মাধ্যমে আজ তা প্রশ্নবিদ্ধ! শিশুর চির আকাঙ্ক্ষিত ‘মাতৃক্রোড়’ যেন আজ হয়ে উঠেছে বন্য। মায়ের ভেতরে পুষে রাখা ক্ষোভ, জিঘাংসার মনোবৃত্তি আর অসহিষ্ণুতাই কি মূল কারণ ? নাকি এর পেছনে অন্য কোন বিষয়?
আমরা সবসময় জেনেছি সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো মায়ের কোল। কিন্তু এখন সেই নিরাপদ মমতাময় স্থানটি যেন আর আগের মতো নেই। সন্তান হত্যার অপরাধে আজ কলঙ্কিত সেই মায়ের কোল! আজ সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ভিডিও ফুটেজ বেরিয়েছে যেখানে মা তার সন্তানকে গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। ক’দিন আগে একজন মা তার চৌদ্দ দিন বয়সী সন্তানকে মেরে ফেলেছেন। তার আগে আরও একজন মা সন্তানের কান্না সহ্য না করতে পেরে মেরে ফেলেছেন। আর একজন গর্ভবতী মায়ের অমানবিক নির্যাতন থেকে তার প্রথম শিশু সন্তানকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। বর্তমান সময়ে এ বিষয়টি যেন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। অতীতেও মায়ের হাতে সন্তান হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটেছে । পরকীয়ার কারণে শিশুকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা, পুড়িয়ে মেরে ফেলা এবং মেরে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মতো ঘটনা আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দেখেছি। সেসব ছিলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একটা দু’টো ঘটনা এবং নিঃসন্দেহে তা ছিলো নিন্দনীয় শিশুহত্যা। আবার কিছু ক্ষেত্রে সন্তানদের হত্যা করে মায়ের আত্মহত্যার ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। সেসব ক্ষেত্রে মায়েদের পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ না থাকলেও অনুমান করা গেছে যে সন্তানদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে মা এরকম কাজ করেছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের ঘটনাগুলোর সাথে পরকীয়া বা তেমন কোন অপরাধমূলক উদ্দেশ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিটি বিষয় আইনের আওতায় এলেও তা থেকে মায়েদের অসহিষ্ণুতা বা ধৈর্যহীনতা ছাড়া তেমন কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা ভাবিয়ে তোলার মতো। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মায়েদের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। সন্তানকে হত্যা করার পরেও তাদের মধ্যে কোন রকম অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অনেকেরই সন্তান প্রসবের পর মানসিক অবসাদ বা কারো কারো ক্ষেত্রে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। যদি আমরা ধরে নিই সেই মানসিক অবসাদের বা অসুস্থতার বশবর্তী হয়ে মায়েরা এধরনের কাজ করছেন তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এতোজন মা মানসিক অবসাদের শিকার কেন হচ্ছেন?
আমাদের দেশে এখন গর্ভবতী মায়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । গর্ভবতীদের খাবার, ওষুধ, পথ্য, মেডিকেল ফলো আপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সব ধরনের পরিবারেই বেশ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। সেই তুলনায় মানসিক পরিচর্যা খানিকটা পিছিয়ে আছে। তাছাড়া সন্তান প্রসবের পরের সময়টায় মায়ের যে একটু বেশি পরিচর্যা ও মানসিক সাপোর্টের দরকার হয় সে বিষয়টি এখনো খুব একটা আমলে আসে না। এ বিষয়টি আসলে মূলত তাদের পারিবারিক পরিবেশ, দাম্পত্য সম্পর্ক, আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক পরিমন্ডলের ওপর নির্ভর করে। মানসিক বিষয়টি প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে আলাদা এবং প্রয়োজনীতাগুলোও আলাদা হয়। যে কারণে বাইরে থেকে খানিকটা মানসিক সাপোর্ট দেয়া গেলেও পুরোপুরিভাবে দায়িত্ব নেয়া কারো পক্ষে সম্ভব হয় না। এই দায়িত্ব যারা তাদের কাছে থাকে, তাদের মন মানসিকতা বোঝে পরিবারের সেই সদস্যদের এবং বিশেষত স্বামীকে নিতে হবে। যদি কোন অসংলগ্নতা দেখা যায় তাহলে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মনে রাখতে হবে মানসিক অবসাদ মানে পাগল নয় এটি এক ধরনের সাময়িক সমস্যা যা নিরাময়যোগ্য।
একজন মা সন্তানের গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে–এটা কোন স্বাভাবিক দৃশ্য তো হতে পারে না। এই মায়ের চিকিৎসার প্রয়োজন। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে বা দ্রুত শিশুটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসার পরিবর্তে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করাও একটা অস্বাভাবিক আচরণ। একটি সভ্য সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থায় এক ধরনের আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। নারী সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মায়েদের সঠিক যত্নায়ন খুবই গুরুত্বপূর্র্ণ। কোন মায়ের কোন যেন সন্তানহত্যার মতো গুরুতর অপরাধে কলঙ্কিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।










