
প্রফেসর ডা. এল এ কাদেরী। তিনি একজন চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সংগঠক ও সমাজসংস্কারক। সাহসী, দূরদর্শী মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর বাবা উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংস্কারক, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সৈনিক ও প্রখ্যাত আইনবিদ আবদুল লতিফ উকিল। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম পীরে কামেল হযরত মৌলানা নুর আহমদ কাদেরী সাহেবের দ্বিতীয় কন্যা। আইনবিদ আবদুল লতিফ উকিলের নামের অংশ ‘লুৎফুল’ এবং মা আনোয়ারা বেগমের ‘কাদেরী’ পদবী যুক্ত করে তাঁর নাম রাখা হয় লুৎফুল আনোয়ার কাদেরী।
১৯৬৫ সালের ২০ জানুয়ারি আইনবিদ আবদুল লতিফ উকিল ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি সদ্য পাস করে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। অত্যন্ত দূরদর্শী, সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা ও প্রগতিশীল পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতেন তিনি। যে সময়ে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে (গোল্ড মেডেলসহ) এমবিবিএস উত্তীর্ণ হন, তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। সমগ্র পাকিস্তানজুড়ে নিউরোসার্জারির অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেই পর্যায়ে নিউরো মেডিসিন বা নিউরোসার্জারির ধারণাই ছিল বিরল। এমন একটি সময়ে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে তিনি নিউরোসার্জারিতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাতে পাড়ি জমান। আমরা ছোট ভাইবোনেরা তাঁকে বিদায় জানাতে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন তাঁর নববিবাহিতা–স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। প্রায় সাত বছর লন্ডনে পড়াশোনা ও হাসপাতালের কর্মময় জীবন কাটালেও তিনি বিলেতি হননি, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক–বাহক হিসেবেই থেকেছেন।
তাঁর প্রগতিশীল মন, স্বদেশপ্রেম এবং জন্মভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। চলনে–বলনে, কাজেকর্মে পরিচ্ছন্ন, মিতব্যয়ী ও রুচিশীল মানুষ ছিলেন। ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করে ব্রিটেনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে যোগদান করেন। তাঁকে কেন্দ্র করেই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে নিউরোসার্জারি বিভাগের কার্যক্রম বিকশিত হয়। বিদেশের লোভনীয় সুযোগ কিংবা মোটা সম্মানীর প্রলোভন তাঁকে কখনো আকৃষ্ট করতে পারেনি। এমনকি ঢাকায় পদায়নের সুযোগও তিনি এড়িয়ে চলতেন। চট্টগ্রামই ছিল তাঁর কর্ম ও সাধনার ক্ষেত্র।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও সময়নিষ্ঠ। তাঁর জীবন যেন চলমান এক ঘড়ি। ঘড়ির কাটায় ভোরে জেগে ওঠা,সকালের নাস্তা, হাসপাতাল, বাসা, আবার হাসপাতাল, সন্ধ্যায় চেম্বার। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম কিংবা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কোনোটাই তাঁর পছন্দ ছিল না। প্রচুর পড়াশোনা করতেন–একজন সত্যিকারের বইপ্রেমী।
চট্টগ্রামের মেজবানি অনুষ্ঠান তাঁর খুব পছন্দ ছিল। অনুষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে দেখা–সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করে আনন্দ পেতেন। আত্মীয়স্বজনের মেজবানিতে ঝাল–ঝোলে গরম মাংস এবং গরুর পায়া তাঁর জন্য আমরা তুলে রাখতাম। আমরা জানতাম, রাত যতই হোক তিনি আসবেন।
সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বিস্তার এবং ধর্মীয় কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। চট্টগ্রাম নগরের অনেক দাতব্য সংগঠন, চিকিৎসালয় ও সমাজকল্যাণমূলক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা বা উপদেষ্টা ছিলেন। হাটহাজারীর নিজ গ্রামে স্কুল, মক্তব ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আর্থিক সহায়তায় ফটিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাটহাজারী উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়।
একবার হাটহাজারীতে আত্মীয়ের বাড়ির একটি মেজবানি অনুষ্ঠানে আমাদের দাওয়াত ছিল। অনুষ্ঠানের আগের দিন আমাকে ফোন করে বললেন, ‘তুমি কি ওখানে যাবে? গেলে আমাকে সঙ্গে নিও।’ পরদিন সকালে তাঁর বাসভবন ‘সোনার তরী’ থেকে আমরা একসঙ্গে রওনা হলাম। পথজুড়ে স্মৃতিচারণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নিয়ে কথা বললেন। মনে হলো, কিছুক্ষণের জন্য তিনি রোগী, হাসপাতাল ও নগরজীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন।
ফেরার পথে তিনি আমাকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে নিজ উদ্যোগে নির্মিত স্থাপনা, সংস্কার করা মসজিদ, পারিবারিক কবরস্থান, নতুন মক্তব ও দাতব্য চিকিৎসালয় ঘুরে ঘুরে দেখালেন। সবকিছু এক ধরনের শিশুসুলভ আনন্দ নিয়ে দেখাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, যেন তাঁর শেকড়ের কাছে ফিরে এসেছেন।
এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। একজন দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষ হিসেবে প্রফেসর ডা. এল এ কাদেরীর আদর্শ, শিক্ষা, কর্ম ও স্বদেশপ্রেম আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর স্মৃতি ও অবদান যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
লেখক : আমিনুর রশীদ কাদেরী, প্রাবন্ধিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ওয়াগ্গাছড়া টি লিমিটেড












